সাংহাই সম্মেলনে দেখা হচ্ছে শি-পুতিন-পেজেশকিয়ানের, এজেন্ডায় কী

চীনের তিয়ানজিনে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনে ছবি তোলার অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ বিভিন্ন দেশের নেতারা, ৩১ আগস্ট ২০২৫। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিং এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ সদস্য দেশগুলোর সরকারপ্রধানরা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) দুদিনের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেবেন।
সোমবার কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে সম্মেলন শুরু হচ্ছে। সংগঠনটির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবারের সম্মেলন হচ্ছে।
‘টেকসই শান্তি, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য একসঙ্গে’— এই স্লোগান সামনে রেখে সম্মেলন হচ্ছে। এমন এক সময়ে এই আয়োজন হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে বড় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি চলছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ।
শি, পুতিন, ও পেজেশকিয়ানের সঙ্গে ভারত, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, বেলারুশ ও কাজাখস্তানসহ আরও কয়েকটি দেশের নেতারা সম্মেলনে যোগ দেবেন।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং আসিয়ান মহাসচিব কাও কিম হর্নও থাকার কথা রয়েছে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেছেন, চলমান যুদ্ধগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে চীন ও ভারতের মতো উদীয়মান শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতাও বাড়াতে পারছে।
তার মতে, বহু বছর ধরে এসসিও-কে বহুশক্তিকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় চীনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুরুতে এটি নিরাপত্তা সহযোগিতায় সীমিত ছিল। পরে সদস্যসংখ্যা ও কার্যক্রমের পরিধি দুটোই বাড়ে।
ইয়াং বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের যুদ্ধের মধ্যে চীন এবারের সম্মেলনকে নিজেদের শান্তিপ্রিয় পরাশক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের পার্থক্য আরও স্পষ্ট হবে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তব কোনো শান্তি প্রস্তাবের বদলে বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা বেশি।
১৯৯৬ সালে চীন, রাশিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তানকে নিয়ে এসসিওর যাত্রা শুরু হয়। তখন এর নাম ছিল ‘সাংহাই ফাইভ’। শীতল যুদ্ধের পর সীমান্ত বিরোধ মেটানো ছিল এর মূল লক্ষ্য।
২০০১ সালের জুনে সংগঠনটি এসসিওতে রূপ নেয়। তখন উজবেকিস্তানও এতে যোগ দেয়। সংগঠনটির সদর দপ্তর করা হয় বেইজিংয়ে।
২০১৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান পূর্ণ সদস্য হয়। ইরান ২০২৩ সালে এবং বেলারুশ ২০২৪ সালে পূর্ণ সদস্য হয়।
এখন সৌদি আরব, কাতার, মিসর, তুরস্ক, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা ও কম্বোডিয়াসহ ১৪টি দেশ এসসিওর সংলাপ অংশীদার।
এসসিওর সদস্য দেশগুলোয় বিশ্বের ৪৩ শতাংশ মানুষ বাস করে। বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় ২৩ শতাংশও এই দেশগুলোর দখলে।
নিরাপত্তা দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন বাণিজ্য ও অর্থনীতিসহ গ্লোবাল সাউথের বিভিন্ন বিষয়েও কাজ করছে এসসিও। এ কারণে ব্রিকসের মতো অন্য জোটগুলোর সঙ্গে এর পার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
এসসিও সচিবালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আফগানিস্তানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি সম্মেলনে গুরুত্ব পাবে।
আলোচনায় আসবে ভারত ও চীনের সম্পর্কও। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুদেশের মধ্যে পাঁচ বছর উত্তেজনা ছিল। গত বছর থেকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভারতীয় পণ্যে শুল্ক আরোপের পর নয়াদিল্লি বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আরও আগ্রহী হয়। ২০১৮ সালের পর গত বছরই প্রথমবার এসসিও সম্মেলনে যোগ দিতে চীন সফর করেন মোদি।
ভারত ও পাকিস্তানের চলমান সীমান্ত উত্তেজনাও আলোচনায় আসতে পারে। নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সহযোগিতার দিকেও নজর দিতে পারে এসসিও।
তাক্ষশিলা ইনস্টিটিউশনের ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ মনোজ কেওয়ালরামানি বলেছেন, অর্থনৈতিক একীকরণ ও আর্থিক সহযোগিতার কাঠামো নিয়ে এবারের সম্মেলনে অগ্রগতি হতে পারে।
তিনি জানিয়েছেন, তিয়ানজিনে এসসিও উন্নয়ন ব্যাংক গঠনের বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। কিরগিজ নেতৃত্বের অগ্রাধিকার হচ্ছে এই ব্যাংক, এসসিও উন্নয়ন তহবিল ও বিনিয়োগ তহবিল নিয়ে কাজ এগিয়ে নেওয়া। তবে সম্মেলনে এ বিষয়ে কোনো চুক্তি হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধের কারণে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে বিশ্ব সরবরাহব্যবস্থা, জ্বালানি বাজার ও আর্থিক বাজারে বড় প্রভাব পড়েছে। তাই অর্থনৈতিক যোগাযোগও সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে।
এসসিও নতুন বাণিজ্য ও পরিবহন করিডর নিয়েও আলোচনা করবে। এর মধ্যে ৭ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডর রয়েছে। এটি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ বন্দরকে ইরান ও উপসাগরীয় বন্দর হয়ে ভারতের মুম্বাইয়ের সঙ্গে যুক্ত করে।
সূত্র : আলজাজিরা








