১৩ ডলার ধার নিয়ে দিনের পর দিন হাঁটছেন নেপালি বাবা

তালকা সাদা ও বামদিকে তার ভাই। ছবি : আলজাজিরা
ক্লান্ত চোখ তাকিয়ে আছেন তালকা সাদা। মুখের ভাঁজে দুশ্চিন্তার ছাপ। নেপালের পাহাড়ি পথে দীর্ঘ হাঁটার কারণে তার গোড়ালি ব্যথায় ভরা। ক্ষুধার্ত তিনি, ক্ষুব্ধও।
কখনো তার মনে জাগে আশা। পরক্ষণেই ভর করে অসহায়ত্ব। তবু লক্ষ্য একটাই—ছেলেকে খুঁজে বের করা।
পঞ্চাশের কোঠায় তালকা সাদা নেপালের তরাই অঞ্চলের সপ্তরি জেলার বাসিন্দা। দক্ষিণ নেপালের বিস্তীর্ণ সমতল এলাকা তরাই। এর দক্ষিণে ভারতের সঙ্গে নেপালের সীমান্ত। উত্তরে শিবালিক পাহাড়।
তরাইয়ের মানুষদের ‘মাধেশি’ বলা হয়। ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিগত পরিচয়ের দিক থেকে তারা নেপালের একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী।
তালকার একমাত্র ছেলে বিনোদ। তিন মেয়েও আছে তার। গত ২৬ আগস্ট ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পর থেকে ১৯ বছর বয়সী বিনোদ নিখোঁজ।
ভোতে কোশি নদীর পানি বেড়ে ওই বন্যা ভয়াবহ রূপ নেয়। উত্তরের নেপালের বিস্তীর্ণ এলাকায় ঘরবাড়ি, স্কুল, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বহু স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়।
বন্যার এক দিন আগে ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয় তালকার। এক মাস আগে রসুয়া জেলায় গিয়েছিল বিনোদ। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি এই জেলা।
সেখানে একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করত সে। সিমেন্ট মেশানোসহ বিভিন্ন কাজ করত। তার সঙ্গে কাজ করা আরও চার তরুণও নিখোঁজ। তাদের সবার বয়স ১৭ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে।
‘আমার স্ত্রী কতটা কাঁদছে, তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। আমিও গভীর কষ্টে আছি। কী করব, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
কথাগুলো বলতে বলতে চোখের পানি মুছছিলেন তালকা।
তার পরনে বিবর্ণ সাদা শার্ট ও কালো প্যান্ট। গায়ে বৃষ্টিরোধী পোশাকের বদলে কমলা রঙের পলিথিন। কাঁধে ধূসর ব্যাগ।
সঙ্গে তার ভাই। ছেলেকে খুঁজতে দীর্ঘ ও কঠিন পথে তিনিও তালকার সঙ্গী হয়েছেন।
তালকার পকেটে থাকা ময়লা রুমালটিতে জড়ানো কয়েকটি নোট। সব মিলিয়ে ২ হাজার নেপালি রুপিরও কম। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৩ ডলারের সমান। এই টাকাও ধার করা।
‘সপ্তরি থেকে এখানে আসার জন্য টাকা ধার করেছি। ধার করা প্রতি ১০০ রুপির বিপরীতে ২০ রুপি সুদ দিতে হবে।’
কাঠমান্ডুতে পৌঁছে তারা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটেছেন। বেঁচে থাকা মানুষের মধ্যে বিনোদ আছে কি না, খুঁজেছেন। মৃতদের তালিকাতেও ছেলের নাম খুঁজেছেন।
উত্তর নেপাল থেকে বন্যার অনেক ভুক্তভোগীকে বিমানে কাঠমান্ডুতে নেওয়া হয়েছিল।
হাসপাতালের মর্গের সামনে রাখা ছবিগুলো অনেক সময় চেনাই কঠিন। উদ্ধার হওয়া বেশির ভাগ মরদেহ পচে গেছে বা খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেছে।
কোথাও বিনোদের দেখা নেই। কোনো হাসপাতালের তালিকায় নেই তার নাম। ছবিও নেই।
এরপর নুওয়াকোটের দিকে হাঁটা শুরু করেন তালকা ও তার ভাই। কাঠমান্ডু থেকে জায়গাটি প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকেই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রটির অবস্থান আরও কাছে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভাঙা সড়ক ধরে হাঁটেন তারা। একপর্যায়ে পৌঁছান ত্রিশূলি শহরে।
শহরের বাজার এখন কাদা, পলি ও ধ্বংসাবশেষে ঢাকা।
‘গত রাতে এখানে পৌঁছালে একটি থাকার জায়গা আমাদের কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ রুপি নেয়। বিনিময়ে সামান্য এক বেলা ভাত দিয়েছে। তাতেও আমাদের পেট ভরেনি।’
তালকা বলেন, ‘আরেক রাত এখানে থাকতে হলে আমার বাকি সব টাকাও শেষ হয়ে যাবে। বাড়ি ফেরার মতো কিছুই থাকবে না।’
দুই ভাইয়ের চাওয়া খুব সামান্য। তারা শুধু মর্গ ও সেনাবাহিনীর স্থাপনাগুলোতে যেতে চান। সেখানে উদ্ধার করা জীবিত মানুষ ও মরদেহ রাখা হচ্ছে। কিন্তু তালকার দাবি, বারবার তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই আচরণের পেছনে নেপালের দীর্ঘদিনের জাতিগত ও বর্ণভিত্তিক বিভাজন কাজ করছে বলে মনে করেন তারা।
তরাইয়ের মাধেশিরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, পাহাড়ি নেপালি অভিজাতদের একটি অংশ তাদের সঙ্গে বৈষম্য করে।
তালকার পরিবার মুসাহার সম্প্রদায়ের। তরাই অঞ্চলের এই জনগোষ্ঠী নেপাল ও ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারেও বসবাস করে। তারা সবচেয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোর একটি।
কাঁদতে কাঁদতে তালকা বলেন, ‘আমরা গরিব। তারা আমাদের মাধেশি ও বিহারি হিসেবে দেখে। আমরা সাবলীলভাবে নেপালি বলতে পারি না। এ কারণেই তারা আমাদের সরিয়ে দিচ্ছে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটিয়ে বেড়াচ্ছে।’
‘মরদেহ হলেও সেটি দেখার অধিকার আমাদের আছে। আমরা সর্বত্র নাম নিবন্ধন করেছি। থানায়, সেনা ক্যাম্পে—সব জায়গায়। কিন্তু কেউ আমাদের সাহায্য করছে না।’
নেপালের কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করছে। ভয়াবহ এই দুর্যোগ সামাল দিতে গিয়ে প্রশাসন চরম চাপে রয়েছে। বন্যায় ১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এখনো নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষ।
তালকা ও তার ভাই আবার বিনোদের ফোন নম্বরে কল করেন। কতবার করেছেন, তার হিসাব নেই। এবারও কোনো সাড়া নেই।
‘আমরা তার সঙ্গে কথা বলতে পারছি না। তার কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছি না। তাই বাড়িতে সবাই ভেঙে পড়েছে।’
তালকা বলেন, ‘আমার স্ত্রী আমাকে বলেছে, আমাদের ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে। তাই আমরা সব জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে খুঁজছি। কিন্তু কোথায় তাকে পাব?’
এক মুহূর্তে তালকার মনে আশার আলো জ্বলে ওঠে।
‘আমার ছেলে তরুণ। সে মাল বহনের কাজ করে। দিনমজুর। তাই সে চটপটে। হয়তো কোথাও হেঁটে বা দৌড়ে চলে যেতে পেরেছে।’
পরক্ষণেই সেই আশা নিভে যায়। ‘আমার কোনো আশা নেই।’
তালকা বলেছেন, ‘বিনোদ বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই কোথাও থেকে ফোন করত। পানি খেতেও কোথাও গেলে ফোন করত।’
তবু হাল ছাড়ছেন না তিনি। অন্তত এখনো নয়।
দুই ভাই আবার পথে নামার প্রস্তুতি নেন। এবার গন্তব্য সেই জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। সেখানে বিনোদ কাজ করত।
হাঁটা শুরুর আগে তালকার কণ্ঠে জমে থাকা ক্ষোভ বেরিয়ে আসে।
‘কেউ যদি আমাদের কথা না শোনে, সাহায্য না করে, তাহলে আমাদের থানায় আগুন দিতে হবে।’
বলেই আবার ছেলের খোঁজে পথে হাঁটা শুরু করেন তিনি।
সূত্র : আলজাজিরা








