হিমালয়কন্যায় মানবিক বিপর্যয়
নেপালকে ১ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিচ্ছে বাংলাদেশ

নেপালে রাসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকার কাছে সৈন্যরা একজনের মরদেহ উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছেন। ছবি: রয়টার্স
হিমালয়ের কোলঘেঁষা বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র নেপালে সাম্প্রতিক সময়ে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় সৃষ্ট নজিরবিহীন মানবিক সংকটে দ্রুত ও সময়োপযোগী প্রতিক্রিয়া জানাল বাংলাদেশ সরকার। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনায় দুর্যোগ আক্রান্ত নেপালি জনগণের জরুরি ত্রাণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১২ কোটি ৩০ লাখ টাকা) আর্থিক অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারের কাছে এ বিশেষ আর্থিক বরাদ্দের প্রাতিষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হলে অর্থ মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় তহবিল ছাড়ের নীতিগত অনুমোদন দেয়। এ তথ্য জানা যায় অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে।
প্রশাসনিক নথিপত্রের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই সিদ্ধান্তটি শুধু একটি তাৎক্ষণিক আর্থিক সাহায্য বা দানশীলতা নয়, বরং এর মূলে রয়েছে ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য, দূরদর্শী ‘দুর্যোগ কূটনীতি’ এবং সার্কের প্রতিষ্ঠাতা নীতিমালার আলোকে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক দক্ষিণ এশীয় সহমর্মিতার মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তি।
কাঠমান্ডুর বিপর্যয় : ভূমিরূপ ধ্বংস ও নজিরবিহীন মানবিক সংকট
গত বুধবার নেপালের উত্তরাঞ্চলে আঘাত হানে এই প্রলয়ংকরী প্রাকৃতিক দুর্যোগ। পাহাড়ি ঢল, আকস্মিক প্লাবণ ও ধারাবাহিক ভূমিধসে গোটা অঞ্চলের বসতি ও মৌলিক অবকাঠামো লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে। এখন পর্যন্ত দুর্যোগে ১ হাজার ৫০ জনের মতো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালের বেডে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন বহুসংখ্যক সাধারণ নাগরিক।
তদুপরি, মানবিক বিপর্যয়ের প্রকৃত ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে নিখোঁজ তালিকার তথ্যে। সাধারণ অধিবাসী, নেপালি সশস্ত্র বাহিনী এবং স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় চার হাজারের অধিক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম পার্বত্য এলাকা এবং প্রধান সড়ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণে নিখোঁজ ব্যক্তিদের নিখুঁত তথ্য ও সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা ব্যাহত হচ্ছে।
প্রকৃতির এ বিধ্বংসী রূপে নেপালের আবাসনব্যবস্থা ও সামগ্রিক কাঠামোগত ভিত্তি চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে। হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। দেখা দিয়েছে পানের অযোগ্য পানি ও বিশুদ্ধ খাদ্যদ্রব্যের তীব্র সংকট। পর্যাপ্ত জরুরি ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবার প্রাতিষ্ঠানিক অভাবে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দেখা দিয়েছে মহামারী ও স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবিলম্বে এগিয়ে আসা অনিবার্য হয়ে উঠেছিল।
পররাষ্ট্র বিভাগ থেকে অর্থ বিভাগে দাপ্তরিক নির্দেশ
আন্তর্জাতিক মানবিক সীমানায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্রুত স্পষ্ট করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বিভাগে গতকাল মঙ্গলবার একটি গুরুত্বপূর্ণ আধা-সরকারি/দাপ্তরিক নোট পাঠানো হয়।
ওই চিঠিতে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করা হয় যে, উদ্ভূত মানবিক সংকটের সার্বিক গুরুত্ব ও নেপালের সঙ্গে চমৎকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নেপালের ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান হিসেবে হস্তান্তরের নির্দেশনা দিয়েছেন। এ নির্দেশনা অনুসরণে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে দ্রুত অনুদান হস্তান্তরের সমন্বিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। জাতীয় বাজেটের বিশেষ খাত থেকে জরুরি ভিত্তিতে অনুদান ছাড় করা আন্তর্জাতিক তদারকি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সুদৃঢ় অঙ্গীকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
মানবিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই আন্তর্জাতিক এবং বিশেষত প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সংকটকালে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে এক গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা বিবরণীতে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে পূর্ববর্তী দুর্যোগগুলোয় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আফগানিস্তানে হওয়া ভূমিকম্পের পর তাৎক্ষণিক ওষুধ, শুকনো খাবার ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠায় বাংলাদেশ। ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে শ্রীলঙ্কায় ঘূর্ণিঝড়ের পর দ্রুততম সময়ে ত্রাণ সহায়তা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাঠানো হয়েছিল।
শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক ধসের সময়ে আন্তর্জাতিক মানবিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে বাংলাদেশ সাশ্রয়ী আন্তর্জাতিক নীতির আওতায় প্রায় ১৬ কোটি টাকা সমমূল্যের জরুরি ওষুধ অনুদান হিসেবে দিয়েছে। ২০১৫ সালের নেপালে ভূমিকম্পের পর রাষ্ট্রীয় সহায়তা এবং সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে বিপুল পরিমাণে ত্রাণ পৌঁছে দিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশংসা কুড়ায় বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারী চলাকালে সংকটে পড়া ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ ও ভারতে সরাসরি জরুরি ওষুধ ও মেডিকেল সরঞ্জাম পাঠিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ঢাকা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ স্বয়ং একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে রূপান্তরের পথে থাকলেও, নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতাকে ছাপিয়ে জাতীয় বাজেট থেকে সরাসরি আর্থিক ও বৈষয়িক অনুদান প্রদান দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
নেপাল-বাংলাদেশ বহুমাত্রিক সম্পর্ক
বাংলাদেশ ও নেপালের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক কেবল আঞ্চলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়, বরং এটি অত্যন্ত সুদৃঢ় ও বহুমুখী। প্রধানত দুটি ভিত্তিস্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এই সম্পর্ক। এক. ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে পূর্ণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া বিশ্বের অষ্টম দেশ ছিল নেপাল। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশের সূচনাপর্বে কাঠমান্ডুর এই ইতিবাচক কূটনৈতিক অবস্থান ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। দুই. সার্ক নিয়ে নেপালের সহযোগিতা। তৎকালীন বাংলাদেশ সরকার ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অগ্রগামী দূরদর্শী চিন্তার ফসল ছিল ‘সার্ক’। নেপাল এই আঞ্চলিক জোটের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাই নয়, দেশটির রাজধানী কাঠমান্ডুতেই অবস্থিত সার্কের স্থায়ী সচিবালয়।
সরকারি স্মারকে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, সার্কের মূল প্রতিষ্ঠাতার যেকোনো চরম বিপদে পাশে দাঁড়ানো বাংলাদেশের কূটনৈতিক নৈতিক দায়িত্ব। বর্তমান সংকটে ১ মিলিয়ন ডলার সাহায্য প্রদান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে।
বাজেটের ওপর প্রভাব ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য
পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কাঠামোর ‘বৈদেশিক সাহায্য ও মানবিক অনুদান’ খাত হতে দেওয়া হবে এ টাকা।
বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার মতো নানা ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানবিক সাহায্য অব্যাহত রাখা বাংলাদেশের কৌশলগত দূরদর্শিতার বহিঃপ্রকাশ। এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ কেবল অন্যান্য বৈশ্বিক সংস্থার অনুদান গ্রহণকারী রাষ্ট্র নয়, বরং আঞ্চলিক যেকোনো অর্থনৈতিক বা প্রাকৃতিক সংকটে স্বয়ংসম্পূর্ণ অনুদানদাতা রাষ্ট্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতে প্রস্তুত।







