ধ্বংসস্তূপে চলছে জীবনের খোঁজ
চেনা চেহারায় ফিরছে ভোটেকোশী, ফেরেনি শুধু চার হাজার প্রাণ
- হাজার হাজার দীর্ঘশ্বাসে থমথমে নেপাল
- বন্যায় নিখোঁজদের ‘প্রতীকী শেষকৃত্য’

ভোটেকোশীর তীরে অপেক্ষা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে কেউ এখনো অলৌকিকভাবে ফিরে আসার প্রার্থনা করছেন, আবার কেউ প্রিয়জনের দেহটুকুও না পেয়ে খড়-কুশের প্রতিকৃতি বানিয়ে করছেন শেষকৃত্য।
নদী ধীরে ধীরে ফিরছে নিজের খাতে। কাদায় ডুবে যাওয়া পথ থেকে সরছে ধ্বংসস্তূপ, কোথাও ফিরেছে বিদ্যুৎ, কোথাও আবার বাজছে ফোন। দূর থেকে মনে হতে পারে, ভোটেকোশী বুঝি চেনা জীবনে ফিরছে। শুধু ফিরছে না মানুষগুলো। কারও বাবা, কারও সন্তান, কারও স্বামী কিংবা স্ত্রী— এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তাদের জন্য দরজার দিকে তাকিয়ে আছে হাজার হাজার চোখ। অপেক্ষা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে কেউ এখনো অলৌকিকভাবে ফিরে আসার প্রার্থনা করছেন, আবার কেউ প্রিয়জনের দেহটুকুও না পেয়ে খড়-কুশের প্রতিকৃতি বানিয়ে করছেন শেষকৃত্য। বিবিসি, সিএনএন, কাঠমান্ডু পোস্ট।
গতকাল বুধবার পর্যন্ত নেপালের জাতীয় দুর্যোগ কর্তৃপক্ষের হিসাবে দেশটিতে ৩ হাজার ৯১৬ জনের এখনো খোঁজ নেই। সীমান্তের ওপারে তিব্বতে আরও ৫৪৬ জন নিখোঁজ বলে জানিয়েছে চীনের আঞ্চলিক সরকার। অর্থাৎ দুই দেশ মিলিয়ে এখনো ৪ হাজার ৪৬২ মানুষের কোনো সন্ধান নেই। তিব্বতে মৃতের সংখ্যা ১৬।
তবে নেপালের সরকারি হিসাবেই রয়েছে পার্থক্য। এদিন ভোর ৫টা পর্যন্ত নেপাল পুলিশের নিজস্ব হালনাগাদে ১ হাজার ১২৭টি মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি ৪ হাজার ৮৫৮ নিখোঁজের সন্ধান চলার কথা বলা হয়েছে। ৭ হাজার ৯১২ পুলিশ সদস্য উদ্ধার ও ত্রাণকাজে নিয়োজিত। ব্যবহার করা তথ্যের সময় ও তালিকা হালনাগাদের পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের সংখ্যায় এই ফারাক দেখা যাচ্ছে।
এ সংখ্যার আড়ালেই জমছে সবচেয়ে ভারী শোক। মঙ্গলবার কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ মন্দিরের বাগমতী নদীর তীরে নিখোঁজ স্বজনদের ‘প্রতীকী শেষকৃত্য’ করেছে বহু পরিবার। ১২ বছরের রোজেল শ্রেষ্ঠা খড় ও যব দিয়ে বানানো বাবার প্রতিকৃতিতে আগুন দিয়েছে, বাবার দেহ সে পায়নি। হিন্দু বিশ্বাসে স্বজনের দেহ না মিললে এমন প্রতীকী শেষকৃত্যের মাধ্যমে তার আত্মার মুক্তি কামনা করা হয়। বুধবারও পশুপতি আর্যঘাটে বহু পরিবার কুশের প্রতিকৃতি দাহ করেছে।
তিব্বতেও এতদিনে খুলেছে দুর্গত এলাকার দরজা। ধসে বিচ্ছিন্ন গিরং সীমান্তবন্দরে যাওয়ার জি২১৬ মহাসড়ক গতকাল ফের সচল করেছে চীন। ফলে প্রথমবার ভারী উদ্ধারযন্ত্র মূল বিপর্যয়স্থলে পৌঁছতে পেরেছে। দুই হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী, সেনা ও প্রকৌশলী সেখানে কাজ করছেন; নামানো হয়েছে প্রাণ শনাক্তকারী যন্ত্র ও অনুসন্ধানী কুকুর। তবে বৃষ্টি, ভূমিধস আর পাহাড় থেকে পাথর ধসের ঝুঁকি এখনো অভিযানকে কঠিন করে রেখেছে।
নেপালেও থামেনি খোঁজ। বিশেষ নজর এখন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গগুলোয়, যেখানে আটকে থাকা শ্রমিকদের কেউ এখনো বেঁচে থাকতে পারেন বলে আশা করছেন উদ্ধারকারীরা।
ভোটেকোশীর জল একদিন আরও শান্ত হবে। রাস্তা জোড়া লাগবে, সেতু উঠবে, পাহাড়ের গায়ে আবার ঘর হবে। কিন্তু যেসব বাড়ির দরজায় এখনো মানুষের ফেরার অপেক্ষা, সেখানে এই বন্যা শেষ হবে কবে? হয়তো সেই উত্তর নদীর কাছেও নেই।





