হরমুজের টোল নিয়ে ভাবছে ইউরোপ

সংগৃহীত ছবি
জন্য ইরানের দেওয়া প্রস্তাবগুলো খতিয়ে দেখছে ইউরোপ। তবে এই টোল কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক করা যাবে না এবং সামুদ্রিক পরিবহন নিয়ন্ত্রণকারী জাতিসংঘ সংস্থা আইএমওর সমর্থন থাকতে হবে বলে জানিয়েছে তারা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর কার্যত প্রণালিটি বন্ধ করে দেয় তেহরান। সম্প্রতি তারা শর্তসাপেক্ষে কিছু জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়। একই সঙ্গে এখন থেকে প্রণালিটি পার হতে জাহাজগুলোকে টোল দিতে হবে বলে অনড় অবস্থান প্রকাশ করে আসছে। গার্ডিয়ান।
ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির ভাষ্য, বাধ্যতামূলক টোল আরোপ করা হলে তা বিপর্যয় ডেকে আনবে। তবে তার মন্ত্রিসভার কিছু সহকর্মী স্বীকার করেছেন, মালাক্কা প্রণালি এবং ইংলিশ চ্যানেলসহ অনেক প্রাকৃতিক জলপথে নির্দিষ্ট নেভিগেশনাল সেবার জন্য অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা অনুমোদিত রয়েছে।
এমন এক সময়ে এ প্রস্তাবের কথা সামনে এলো যখন মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, ‘ইরান যেন জনসমক্ষে একটি বিবৃতি দিয়ে জানায় যে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ করিডর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর ওপর আর কোনো হামলা চালানো হবে না।’ মার্কিন কর্মকর্তারা তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো এবং তা মেনে চলার ক্ষেত্রে মূল বাধা হিসেবে দায়ী করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শুক্রবার ট্রুথ সোশ্যালে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, তিনি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে শেষ বলে মনে করছেন। তবে স্থায়ীভাবে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা চালিয়ে যাবে। এর কয়েক ঘণ্টা পর, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইরানের বিরুদ্ধে তাকে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ এনে নতুন করে হুমকি দিয়ে বলেছেন, ‘এক হাজার মিসাইল লক ও লোড করা আছে। সেগুলো তাক করা রয়েছে ইরানের দিকে।’
মালাক্কা প্রণালির নীতিমালার আদলে হরমুজ প্রণালির জন্য একটি প্রস্তাব এরই মধ্যে ব্রিটিশ আইনজীবীদের সহায়তায় তৈরি করেছে ওমান। মাসকট এখন এই পরিকল্পনা বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য তেহরানে তাদের আইনি বিশেষজ্ঞদের পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
ব্রিটেনের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির ভাষ্য, টোল আরোপ বিপর্যয় ডেকে আনবে। তবে মন্ত্রিসভার কিছু সহকর্মী স্বীকার করেছেন, মালাক্কা প্রণালি এবং ইংলিশ চ্যানেলসহ অনেক প্রাকৃতিক জলপথে অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা অনুমোদিত রয়েছে
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ইরনা শুক্রবার জানিয়েছে, এই প্রণালি নিয়ে আলোচনার জন্য শনিবার ওমান পৌঁছেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। গণমাধ্যমটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেরকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, এই সফর হরমুজ প্রণালি এবং নৌ-চলাচলের নিরাপত্তার ওপর কেন্দ্র করে হবে। এটি গত এক বা দুই মাস ধরে ওমানের সঙ্গে শুরু হওয়া পরামর্শের ধারাবাহিকতা।
হরমুজ প্রণালির বেশিরভাগ নৌ-চলাচলযোগ্য জলপথ ওমানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তারা বাধ্যতামূলক টোলের বিরোধিতা করছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের পরিপন্থী উপায়ে ইরানকে এ প্রণালির ওপর সার্বভৌমত্ব দেওয়া হবে মূলত যেকোনো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর কাছে জিম্মি হওয়া মেনে নেওয়া। যারা যখন-তখন এ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে চায়।
তবে ওমানের এই বিকল্প পরিকল্পনা ইরানিদের, বিশেষ করে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নাও মিলতে পারে। একজন কূটনীতিক বলেছেন, আইআরজিসির কিছু অংশ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র গত ফেব্রুয়ারিতে তাদের ওপর একটি অবৈধ হামলা চালিয়েছিল, তাই তারা কেন আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন মেনে চলবে? আবার অন্যরা সহযোগিতা করতে চায়। তেহরানের ভেতরে এ বিষয়ে বিভাজন রয়েছে।
ইরান এই ফি আদায়ের বিষয়টি বাস্তবে বাধ্যতামূলক করবে কি না, তা স্পষ্ট করার জন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর পক্ষ থেকেও চাপের মধ্যে রয়েছে। লন্ডনে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস জানিয়েছে, এনার্জি পলিসি রিসার্চ গ্রুপের স্বাধীনভাবে প্রস্তুত করা প্রস্তাবগুলোর প্রতি আগ্রহ রয়েছে তাদের। ওই গবেষণাপত্রে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আঞ্চলিক ব্যবস্থার মধ্যে স্বচ্ছ সেবা ফি যুক্ত থাকলে তা সব পক্ষকে সহযোগিতা করতে উৎসাহিত করবে। এটি শুধু প্রণালি পার হওয়ার জন্য জাহাজের ওপর আরোপিত কোনো টোল নয়।
গত বৃহস্পতিবার লন্ডনে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) বৈঠকে কিছু উপসাগরীয় ও ইউরোপীয় দেশের জোট একটি প্রস্তাব পাসের জন্য চাপ দেয়। যেখানে জাহাজে হামলা চালিয়ে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার জন্য ইরানের নিন্দা জানানো হয়। তবে এই প্রস্তাবটি সমর্থন করেনি রাশিয়া বা চীন।
রাশিয়া বলেছে, এই সংঘাতমূলক প্রস্তাবটি সংকটের মূল কারণগুলোকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেছে। অন্যদিকে চীন এটিকে একতরফা এবং আইএমওর ম্যান্ডেটের বাইরে বলে অভিহিত করেছে।
একজন কূটনীতিকের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ার দুটি কারণ রয়েছে। একটি হলো প্রণালিটি পুনরায় খোলার সময় এর বিতর্কিত নিয়ন্ত্রণ এবং অন্যটি হলো এই জলপথের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা, যার মধ্যে মালাক্কা প্রণালির মডেলটি ইরানের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা অন্তর্ভুক্ত।




