সীমান্ত পেরিয়ে অপরাধ দমনে রাষ্ট্রগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ চায় জাতিসংঘ

সীমান্তে অপরাধ দমনে রাষ্ট্রগুলোকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মহাপরিচালক অ্যামি পোপ। ছবি: সংগৃহীত
অপরাধী চক্র ও মানব পাচারকারীরা কোনো দেশের সীমান্তকে নিজেদের কর্মকাণ্ডের পথে বাধা হিসেবে দেখে না। তারা পুরো অভিবাসনপথকে একটি বাণিজ্যিক পথ হিসেবে বিবেচনা করে বিভিন্ন দেশের ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সমন্বয়ের ঘাটতি কাজে লাগায়। তাই তাদের মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোকেও সীমান্তের গণ্ডি পেরিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এ আহ্বান জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মহাপরিচালক অ্যামি পোপ। তিনি বলেন, মানুষ যে পথ ধরে নিজ দেশ থেকে যাত্রা শুরু করে গন্তব্যে পৌঁছায়, সেই পুরো পথ বিবেচনায় নিয়েই রাষ্ট্রগুলোর অভিবাসন ব্যবস্থাপনা ও সহযোগিতার কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। অভিবাসনের পথে তৈরি হওয়া চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনাগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, পুরো পথজুড়ে সমন্বিতভাবে মোকাবিলা করা প্রয়োজন।
অ্যামি পোপ বলেন, ‘পাচারকারীরা সীমান্তকে আলাদা কোনো বাধা হিসেবে দেখে না। তারা একটি সম্পূর্ণ পথ দেখতে পায় এবং সেটিকে ব্যবসার মতো পরিচালনা করে। আগে থেকেই পরিকল্পনা করে তারা বিভিন্ন দেশের ব্যবস্থার দুর্বলতা ও পারস্পরিক সমন্বয়ের ঘাটতি কাজে লাগায়।’ তার ভাষ্য, দেশগুলো পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা করলে মানুষের জীবন রক্ষা করা, অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড ব্যাহত করা এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার এই উদ্যোগের সঙ্গে সংস্থাটির পথভিত্তিক পদ্ধতির সম্পর্ক রয়েছে। এ পদ্ধতিতে অভিবাসনের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে কোথায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করা হয়। এরপর যাত্রাপথের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে সেসব সমস্যা মোকাবিলার উদ্যোগ নিতে বলা হয়। অনিয়মিত অভিবাসনের মূল কারণ মোকাবিলা, মানব পাচার ও অবৈধভাবে মানুষ পারাপারের সঙ্গে যুক্ত অপরাধী চক্র দমন এবং পুরো যাত্রাপথে অভিবাসীদের অধিকার রক্ষার বিষয়ও এর আওতায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মতে, এ ক্ষেত্রে দেশগুলোকে একই সময়ে পরিকল্পনা ও কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তবে এর অর্থ কোনো রাষ্ট্রকে নিজস্ব সীমান্তনীতি বা আইন নিয়ন্ত্রণের অধিকার ছেড়ে দেওয়া নয়। প্রতিটি রাষ্ট্র নিজস্ব সীমান্ত ও আইনের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেই অন্য দেশের সঙ্গে তথ্য বিনিময়, কর্মকাণ্ডের সমন্বয় এবং অপরাধী চক্রের সুযোগ তৈরি করে এমন ব্যবস্থাগত ফাঁক বন্ধ করতে পারে।
যুদ্ধ, জলবায়ুজনিত বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ নিজ বাসস্থান ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার ২০২৬ সালের বিশ্ব অভিবাসন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বে অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ৮ কোটি ৩০ লাখের বেশি ছিল। এদের অনেকেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার পথে একাধিক রাষ্ট্রের ভূখণ্ড অতিক্রম করেন। দীর্ঘ ও অনিশ্চিত এই যাত্রাপথে মানব পাচারকারী ও অবৈধভাবে মানুষ পারাপারের সঙ্গে যুক্ত চক্রগুলো তাদের শিকার করে।
পাচার ও অবৈধভাবে মানুষ পারাপারের ব্যবসা এখন হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থের সঙ্গে যুক্ত। এর মূল্য দিতে হচ্ছে অসংখ্য মানুষকে জীবন দিয়ে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে অভিবাসনের বিভিন্ন পথে প্রায় ৮ হাজার মানুষ মারা গেছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন।
চলতি বছর ইউরোপে সমুদ্রপথে মানুষের আগমন আগের বছরের তুলনায় কমেছে। ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ ধরনের আগমন ৩৯ শতাংশ কম ছিল। কিন্তু মানুষের প্রাণহানি কমেনি। একই সময়ে অন্তত ২ হাজার ২৯২ জন মানুষ সমুদ্রপথে মারা গেছেন অথবা নিখোঁজ হয়েছেন। গত বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৯৯।
মানব পাচারের আরেকটি নতুন ও ভয়াবহ দিকের কথাও তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা। গত জুলাইয়ে সংস্থাটি সতর্ক করে জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েক লাখ মানুষকে পাচার করে জোরপূর্বক ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সরকারগুলোর সামনে তিনটি অগ্রাধিকার তুলে ধরছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা। প্রথমত, অভিবাসনের পুরো পথজুড়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়াতে হবে। একটি দেশের সীমান্তে কোনো ঝুঁকি বা অপরাধী তৎপরতা শনাক্ত হলে সেই তথ্য পরবর্তী দেশের সঙ্গে দ্রুত ভাগাভাগি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বৈধভাবে কাজ ও ভ্রমণের সুযোগ বাড়াতে হবে। মানুষের সামনে বৈধ পথে বিদেশে যাওয়া, কাজ করা ও নিরাপদে চলাচলের সুযোগ যত বেশি থাকবে, তত কম মানুষ পাচারকারী ও অবৈধ পথে মানুষ পারাপারকারী চক্রের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হবে। তৃতীয়ত, মানুষের নিজ দেশে কর্মসংস্থান ও জীবিকার সুযোগ বাড়াতে হবে। জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা দিতে হবে এবং তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। মানুষের বিদেশে যাওয়া যেন বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত না হয়ে ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হয়, সেই পরিবেশ তৈরি করাই মূল লক্ষ্য।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মতে, সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত অভিবাসন ব্যবস্থাও মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি করতে পারে। মানুষ যখন দেখতে পায় যে ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল, ন্যায্য ও কার্যকর, তখন অভিবাসন ব্যবস্থাপনার প্রতি জনসাধারণের আস্থাও বাড়ে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলে মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ ও নির্যাতনমূলক অভিবাসনপথে পা বাড়ানোর পরিবর্তে নিরাপদ উপায়ে কাজের সুযোগ নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জানিয়েছে, জাতিসংঘের অভিবাসনবিষয়ক সমন্বিত কাঠামোর পাশাপাশি বেসরকারি খাত, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অংশের সঙ্গেও তারা কাজ করছে। অভিবাসনের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ বাড়ানোই এসব উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
এদিকে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার চলমান সংস্কার উদ্যোগেও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা অংশ নিচ্ছে। জাতিসংঘের ‘আশি’ সংস্কার উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বিভিন্ন সংস্থার কাজের পুনরাবৃত্তি কমানো, সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং বাস্তব ফলাফলের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। এর অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে বিভিন্ন সেবা, তথ্য ও নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ ভাগাভাগি করছে।
সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের পরিচালন বাজেটের ৯৩ শতাংশের বেশি সরাসরি মাঠপর্যায়ের প্রকল্পে ব্যয় হয়। অ্যামি পোপ বলেন, ‘প্রতিটি অর্থের সর্বোচ্চ কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারগুলোর পক্ষ থেকে এ ধরনের দাবি যথার্থ এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাও নিজেদের একই মানদণ্ডে পরিচালনা করে। তবে শুধু দক্ষতা বাড়ানোই শেষ কথা নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ, যাতে সংস্থার হাতে অর্পিত সম্পদ শেষ পর্যন্ত সেই মানুষদের কাছেই পৌঁছায়, যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।’
চলতি বছর আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর পূর্তি হচ্ছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে সংস্থাটির এক দশকও পূর্ণ হচ্ছে। গত এক দশকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা গড়ে প্রতিবছর ১৭০টি দেশে ২ কোটি ৯৩ লাখ মানুষকে সহায়তা করেছে। যুদ্ধ, সংঘাত ও বিভিন্ন মানবিক সংকটে জরুরি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি সংকট-পরবর্তী পুনরুদ্ধারেও সংস্থাটি কাজ করেছে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার এবারের বার্তা তাই শুধু সীমান্ত নিরাপত্তা বা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়। সংস্থাটি বলছে, মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে হলে অভিবাসনের পুরো পথকে একসঙ্গে দেখতে হবে। অপরাধী চক্র যখন এক দেশের সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে পৌঁছে যায়, তখন তাদের মোকাবিলার ব্যবস্থাও এক দেশের সীমানায় আটকে থাকলে চলবে না। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, বৈধ অভিবাসনের সুযোগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলবায়ুজনিত সংকটে মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং পুরো অভিবাসনপথে মানুষের অধিকার রক্ষার সমন্বিত উদ্যোগই হতে পারে এই সংকট মোকাবিলার কার্যকর ভিত্তি।






