জলবায়ু সঙ্কট, জীবাশ্ম জ্বালানি ও পুঁজিবাদ শেষ মেয়াদে খোলামেলা গুতেরেস
‘সত্যিটা বলা আমার দায়িত্ব’, জলবায়ু সঙ্কট নিয়ে শেষবারের মতো সরব জাতিসংঘের মহাসচিব

সংগৃহীত ছবি
'সত্যিটা বলা আমার দায়িত্ব’, জলবায়ু সঙ্কট নিয়ে শেষবারের মতো সরব হলেন জাতিসংঘের মহাসচিব।
‘রাজনীতি চলে ঘণ্টার হিসাবে, জলবায়ুর বিপদ বোঝা যায় দীর্ঘ সময়ে'- জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে শেষ সাধারণ সভার আগে এমনই বার্তা দিলেন আন্তোনিও গুতেরেস। দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে জলবায়ু সঙ্কট, জীবাশ্ম জ্বালানি, পুঁজিবাদ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং নিজের ১০ বছরের কাজ নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি। ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে গুতেরেসের বক্তব্য তুলে ধরেছে ব্রিটিশ সংবাদপত্র ‘দ্য গার্ডিয়ান’।
আগামী ৩১ ডিসেম্বর মাসে রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিব হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হবে গুতেরেসের। তার আগে কোনও মহাসচিবের তুলনায় জলবায়ু সঙ্কট নিয়ে তিনি বেশি সরব হয়েছেন। জীবাশ্ম জ্বালানি সংস্থাগুলির ‘অনৈতিক’ কাজ এবং ‘ভয়াবহ লোভ’-এর সমালোচনা করেছেন তিনি। ২০২৩ সালে সতর্ক করে বলেছিলেন, বিশ্ব যেন ‘নরকের দরজা’ খুলে দিয়েছে। আবার ২০২৫ সালে পরিচ্ছন্ন শক্তির নতুন যুগের কথাও বলেছিলেন তিনি।
কেন জলবায়ুকে এত গুরুত্ব দেন?
গুতেরেসের উত্তর, এটি মানুষের অস্তিত্বের জন্যই হুমকি। তার মতে, বিশ্বের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন নানা স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে ব্যস্ত। রাজনীতি যেখানে ঘণ্টার হিসাবে চলে, সেখানে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ ফল দেখা যায় দীর্ঘ সময়ে। তাই আন্তর্জাতিক সমাজের আলোচনার কেন্দ্রে জলবায়ুকে রাখা রাষ্ট্রসংঘের অন্যতম একটি দায়িত্ব।
বিশ্ব উষ্ণায়ন ঠেকাতে এত দিন কেন ব্যর্থতা?
গুতেরেসের বক্তব্য, জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর বর্তমান উন্নয়ন ব্যবস্থা বজায় রাখতে শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠী কাজ করছে। এই শিল্পের বিপুল মুনাফার অর্থে এমন প্রচারও চালানো হয়। যাতে জীবাশ্ম জ্বালানির ক্ষতি থেকে মানুষের নজর সরে যায়। পাশাপাশি জলবায়ু বিপদের মাত্রা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যেও যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি হয়নি। অবশ্য তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য বিপর্যয় আরও ভয়াবহ হলে মানুষের সচেতনতা বাড়বে বলে আশা তার।
জলবায়ু বিপর্যয় ও জাতীয় নিরাপত্তা
জলবায়ু বিপর্যয়কে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও জুড়েছেন গুতেরেস। উপসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্কটের কথা তুলে তার বক্তব্য, জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির উপর অর্থনীতি দাঁড় করানো যে কোনও দেশের জন্য বড় ঝুঁকি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবী জলবায়ুর এমন কিছু সীমারেখার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যেখান থেকে পরিবর্তন দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। আটলান্টিকের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র স্রোত ধীর হচ্ছে। বাড়তে পারে সমুদ্রের জলস্তরও। ফলে এটি গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিবের ক্ষমতা সীমিত
রাষ্ট্রসংঘের মহাসচিবের ক্ষমতা সীমিত- স্বীকার করেছেন গুতেরেস। অর্থ নেই, সবাইকে হঠাৎ করে নবীকরণযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ করানোর ক্ষমতাও নেই। তবে তার হাতে রয়েছে একটি ‘কণ্ঠস্বর’। তার কথায়, সেই কণ্ঠ দিয়ে আপস না করে সত্য বলা এবং বিপদের বিষয়ে বিশ্বকে সতর্ক করাই তার দায়িত্ব। আগামী দশকে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে নবীকরণযোগ্য শক্তিতে বদল দ্রুত না হলে মানবজাতি বড় সমস্যায় পড়বে বলেও তার অকপট স্বীকারোক্তি।
নিজের ১০ বছরের মেয়াদে আফসোসও
নিজের ১০ বছরের মেয়াদে আফসোসও আছে গুতেরেসের। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার এবং সমাজের সঙ্গে আরও শক্তিশালী জোট গড়া উচিত ছিল বলে মনে করেন তিনি। তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের ধরনও বদলানো দরকার। এছাড়াও ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নতুন ব্যবহারের সঙ্গে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেও মানিয়ে নিতে হবে বলে মত তার।
পুঁজিবাদ নিয়ে বক্তব্য
পুঁজিবাদ নিয়েও সরাসরি প্রশ্নের মুখে গুতেরেস বলেন, বাজারভিত্তিক অর্থনীতি নিজে সমস্যা নয়। তবে তাকে কার্যকর সরকারি নিয়মের মধ্যে রাখতে হবে। সেই নিয়ম তৈরি করতে হবে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানকে। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেসরকারি স্বার্থের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং তা ঠেকানো অতি জরুরি।
স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর ক্ষেত্রেও জলবায়ু মোকাবিলা গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি যাতে ওই দেশগুলিতে স্বৈরতন্ত্র আরও শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহার না হয়, সেই বিষয়েও সতর্ক করেন। তবে আশার জায়গাও দেখছেন গুতেরেস। তার মতে, বিশ্ব এখনও যথেষ্ট করছে না ঠিকই, কিন্তু নবীকরণযোগ্য শক্তির ব্যবহার দ্রুতগতিতে বাড়ছে। উপসাগরীয় সঙ্কট সেই গতি আরও বাড়াতে পারে। কারণ বহু দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানি নির্ভর। তাই নিজেদের স্বার্থেই তাদের নবীকরণযোগ্য শক্তির দিকে আরও দ্রুত যেতে হবে বলে মনে করেন তিনি।



