পায়ের খেলার বিশ্বকাপ বাঁচিয়ে রাখার হাত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
মাঠভর্তি দর্শকের কাছে তারা খলনায়ক, আনন্দে বিঘ্ন ঘটানোর প্রধান কারণ। দলের কাছে তারা সেই উপকারী গাছের মতো, যার ছায়া থেকে পাতা সবকিছুরই সুফল ভোগ করে বাকিরা। কিন্তু একটা ভুল হলেই অতীতের সব উপকার ভুলে যায় সবাই। রবীন্দ্রনাথের পুরাতন ভৃত্যের ‘যা কিছু হারায় গিন্নী বলেন কেষ্টা ব্যাটাই চোর’-এর মতোই ম্যাচ হারলে সবাই দোষ চাপায় গোলকিপারকে। ২০২৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি স্পেন আর বেলজিয়াম। পায়ের খেলা ফুটবলে দুই দলের বিশ্বকাপ স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার প্রধান দুই ভরসা আসলে দুই জোড়া হাত। বেলজিয়ামের থিবো কোর্তোয়া আর স্পেনের উনাই সিমন, দুজন দাঁড়াবেন ৯০ থেকে ১০০ গজের দূরত্বে। কারও সঙ্গে কারও সরাসরি দ্বৈরথ বা লড়াই হয়তো হবে না। তবে দুই দলের দুই শেষ প্রহরীর হাতেই লেখা আছে বিশ্বকাপ ভাগ্য।
শুক্রবার কোয়ার্টার ফাইনালের আগে স্প্যানিশ পত্রিকা এএসকে সিমন বলেছেন, ‘বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচ একটা ফাইনাল; সামনে তিনটা ফাইনাল আছে, যার প্রথমটা বেলজিয়ামের বিপক্ষে।’ প্রতিপক্ষের গোলকিপারকে নিয়ে তার মূল্যায়ন, ‘তার বিশাল শারীরিক গঠনের কারণে গোলপোস্টের সামনে সে অনেকটা জায়গা জুড়ে থাকে। তাকে দেখতে বেশ ভয় জাগানিয়া মনে হয় এবং তার বিপক্ষে গোল করাও বেশ কঠিন।’ চারটি ম্যাচ হয়ে গেল, তবুও এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত স্পেনের জালে গোল করতে পারেনি কোনো দল। ইতালির গোলকিপার ওয়াল্টার জেঙ্গার রেকর্ড ভেঙে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি মিনিট গোল না খাওয়ার রেকর্ড সিমনের, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে জার্মানির ফুলক্রুগের পর এখন পর্যন্ত কেউ বিশ্বকাপের মাঠের খেলায় গোল করতে পারেননি সিমনের বিপক্ষে। যদিও সেবার শেষ ষোলোতে টাইব্রেকারে মরক্কোর কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল স্পেন। এবার সিমন আগের ভুলগুলো থেকে শুধরে নিতে চান নিজেকে, ‘রেকর্ডটি ভাঙতে আগামীতে যারাই আসুক না কেন, তাদের কাজটা যেন আরও কঠিন হয়ে যায়— সেজন্য চলতি বিশ্বকাপে আমাদের খেলার মিনিট (ম্যাচ সংখ্যা বোঝাতে) এবং ক্লিন শিটের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে নিতে চাই।’ এবারও যেন টাইব্রেকারে বিদায় নিতে না হয়, সেজন্য আরও প্রস্তুত সিমন, ‘সব গোলকিপারই কোনো না কোনো কৌশল ব্যবহার করেন। এর পেছনে থাকে পেনাল্টি শট নেওয়া খেলোয়াড়দের নিয়ে করা সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ। আমরা পেনাল্টি শটগুলো দেখি এবং তারা কোন দিকে শট নিতে পারেন, তা অনুমান করার চেষ্টা করি। এরপর পুরো বিষয়টি যার যার ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর নির্ভর করে। একই পেনাল্টি টেকারের ক্ষেত্রে প্রত্যেক গোলকিপারের নোটবুকে আলাদা আলাদা স্পটের কথা লেখা থাকবে। এটি পুরোপুরি ব্যক্তিগত ও নিজস্ব অনুভূতি, যেখানে স্রেফ বিশ্বাস কাজ করে যে তারা ওখানেই শট মারবেন। দিনশেষে এটা এক ধরনের ভাগ্যপরীক্ষাই। তবে আমার মানসিকতা হলো নোটবুকে যে দিকটি ঠিক করে রেখেছি, সেদিকেই শতভাগ ঝাঁপিয়ে পড়া। আর আমার অনুমান যদি সঠিক হয়, তবে আশা করি তারা যেন গোল করতে না পারেন।’
সিমন যদি হন বুনো ওল, তাহলে কোর্তোয়াও বাঘা তেঁতুল। অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদের সাবেক গোলকিপার ও বর্তমানে গোলকিপিং কোচ দানি আরানজুবিয়া বলেছেন, তার চোখে কোর্তোয়া অনন্য, ‘জাতীয় দলসহ ক্যারিয়ারে আমি অনেক গোলকিপারের সঙ্গেই কাজ করেছি, কিন্তু একই সঙ্গে এত লম্বা এবং এত গতিশীল কোনো গোলকিপার এর আগে কখনোই দেখিনি। আমার চেয়েও অনেক বেশি লম্বা গোলকিপারের সঙ্গে আমি খেলেছি, কিন্তু তাদের মধ্যে চটপটে ব্যাপারটা ছিল না। সে সবার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুতগতির এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে দীর্ঘদেহী। গোলপোস্টের একটা বিশাল অংশ সে একাই আগলে রাখত এবং গোললাইনের ওপর তার মুভমেন্ট ছিল বিদ্যুৎগতির। এক কথায়, অসাধারণ কিছু গুণ আছে তার।’
২০ জন মিলে মাঠ জুড়ে ছোটাছুটি করবেন একটা বলের পেছনে, সেই বলটাকে জালে ঢুকতে বাধা দেবেন যে দুজন, দলের ভাগ্য অনেকটাই তো তাদের হাতে। দেবদূতের শহরে (লস অ্যাঞ্জেলেস) কোর্তোয়া কিংবা সিমন, কেউ একজন দলের জন্য হয়ে উঠবেন দেবদূত, আর কেউ হয়তো যমদূত। সেই মানুষটা কে হবেন, তা দেখার জন্যই তো এত অপেক্ষা আর আয়োজন।





