এমবাপ্পের হাসি...

কিলিয়ান এমবাপ্পে । ছবি: সংগৃহীত
ফুটবল মাঠে মার্শাল আর্ট স্টাইলে জাবি আলোনসোর বুকে ফ্লাইং কিক মেরে কুখ্যাত হয়ে আছেন নাইজেল ডি ইয়ং। ২০১০ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলের ফাইনালে স্পেনের মিডফিল্ডারের পাঁজরের হাড় বরাবর লাথি মেরে স্রেফ হলুদ কার্ডই দেখেছিলেন ডাচ ফুটবলার ডি ইয়ং। তাকে এই গুরুপাপে লঘুদণ্ড দিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের রেফারি হাওয়ার্ড ওয়েব। ১৬ বছর পর ওয়েবের মতোই উদার মনের পরিচয় দিলেন ফ্রান্স-প্যারাগুয়ে ম্যাচের রেফারি ইলগিজ তানতাশেভ। তিনি গুরুপাপে লঘুদণ্ড তো দিয়েছেনই, সঙ্গে উদোর পিণ্ডিও চাপিয়েছেন বুধোর ঘাড়ে। ক্রমাগত ফাউল করে গেছেন প্যারাগুয়ের ফুটবলাররা আর কার্ড দেখেছেন ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা! রাগে ক্ষোভে ম্যাচের পর কিলিয়ান এমবাপ্পে বলেছেন, ‘আমরাও কুৎসিত ফুটবল খেলতে জানি।’
২৪টি ফাউল হয়েছে ফ্রান্স-প্যারাগুয়ে ম্যাচে। কাগজে-কলমে এটাই হিসাব। ১৩টি করেছেন ফ্রান্সের ফুটবলাররা আর ১১টি প্যারাগুয়ের ফুটবলাররা। অথচ তানতাশেভ যে ম্যাচে বিশেষ বিশেষ মুহূর্তে কাঠের চশমা চোখে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেটি স্পষ্ট হয়েছে টিভি ধারাভাষ্যকারদের কথায়। আন্দ্রেস কুবাস দুই পা দিয়ে লাথি দিয়েছেন আদ্রিয়াঁ র্যাবিওকে, জুয়ান হোসে সেসেরেস লাথি মেরেছেন এমবাপ্পেকে, গাব্রিয়েল আভোলাস কনুই চালিয়েছেন দাইয়ো উপমেকানোর পেটে, এমনকি পেনাল্টিটাও তিনি নিজে দেননি।
ডিয়াগো গোমেজসহ তিনজন মিলে দুয়েকে পেনাল্টি বক্সের ভেতর ফেলে দিলে ভিএআর সিস্টেম থেকে তাকে মনিটর চেক করতে বলা হলে তারপর তিনি পেনাল্টির সংকেত দেন। সেই স্পটকিকটা কিলিয়ান এমবাপ্পে নিতে যাওয়ার আগেও প্যারাগুয়ের ফুটবলাররা রেফারিকে ঘিরে ধরে রীতিমতো বাংলাদেশের ‘মব সন্ত্রাস’-এর মতো আচরণ করেছেন। গুস্তাভো ভেলাজকুয়েজ তো জুতার ডগা দিয়ে পেনাল্টি নেওয়ার জায়গার মাটিটা খুঁচিয়ে দিয়েছেন, যাতে সেটা অসমান হয়। এত কিছুর পরও কিন্তু কাগজে-কলমে এই ম্যাচে ‘ফেয়ারপ্লে’তে এগিয়ে প্যারাগুয়ে!
আচরণবিধির জন্য এমবাপ্পে মুখ ফুটে সব ক্ষোভ উগরে দিতে পারেননি ম্যাচের পর। তবে মাঠে তাকে উত্ত্যক্ত করতে প্যারাগুয়ের ফুটবলাররা যেভাবে জার্সি টেনে ধরেছে, গালমন্দ করেছে, তার জবাবে এমবাপ্পে শুধুই হেসেছেন। প্রতিবাদ করেছেন ম্যাচের পর হাত না মিলিয়ে। ম্যাচ শেষে সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরাও কুৎসিত ফুটবল খেলতে জানি। ওরা ভেবেছিল আমরা স্যুট পরে (ভদ্রবেশে) মাঠে নামব। তবে আমরা প্রস্তুত ছিলাম। এমনকি মাঠেও আমরা তাদের চেয়ে ভালো করেছি। এটাই ওদের খেলার ধরন। ফুটবলে কোনো ভুল আর শুদ্ধ নেই। তারা তাদের মতো খেলে আমাদের হারানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু আমরাই জিতেছি।’
ফরাসি কোচ দিদিয়ের দেশম প্রথম কোচ হিসেবে বিশ্বকাপে ১০টি নকআউট ম্যাচ জয়ের কৃতিত্ব দেখালেন। ম্যাচশেষে দেশমের ক্ষোভ, ‘আমি তো দলের দুজন শক্তপোক্ত ছেলেকে বলেছিলাম যে, তোমরা সবসময় কিলিয়ানের পাশে থাকো, না হলে ওরা তাকে ছিঁড়ে ফেলবে। জয়টা সহজে আসেনি। তারা যতরকম কৌশল খাটানো সম্ভব সব চেষ্টাই করেছে। এই ধরনের ফুটবল দেখতে কেউ মাঠে আসবে না।’
এমবাপ্পের ঠান্ডা মেজাজেরও প্রশংসা করলেন, ‘এমবাপ্পে এই ম্যাচে যেভাবে আচরণ করেছে, তা সত্যিই আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তারা প্রথম মিনিট থেকেই ওর দিকে তেড়ে এসেছে। ওর সঙ্গে যা হয়েছে, তাতে রাগ করাটা তার ন্যায়সংগত অধিকার, কিন্তু সে শুধুই হেসেছে।’
এই হাসির আড়ােল আছে এমবাপ্পের বড় লক্ষ্য। ৭ গোল নিয়ে তিনি এখন মেসির পাশে, গোলদাতার শীর্ষে। সামনে হাতছানি দিচ্ছে গোল্ডেন বুট অার হৃদয়ের গভীরে শিরোপা জয়ের অদম্য বাসনা। এই স্বপ্নের পথ যে কাঁটা বিছানো তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছেন ফরাসি তারকা। প্রতিপক্ষের কঠিন ট্যাকল ও একের পর এক আঘাত যেন শরীরকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু স্বপ্নের মঞ্চে বীরেরা ব্যথা নয়, গন্তব্যকেই আপন করে নেয়।




