বিশ্বকাপে কঙ্গোর ‘জীবন্ত ভাস্কর্য’

ডিআর কঙ্গোর ম্যাচে এভাবেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন মিশেল এনকুকা এমবোলাদিঙ্গা।
গ্যালারিজুড়ে হাজার হাজার সমর্থক লাফাচ্ছেন, চিৎকার করছেন, ড্রাম বাজাচ্ছেন। কিন্তু সেই উন্মাদনার মাঝে গ্যালারির ঠিক মাঝখানে কাঠের একটি বেদির ওপর দাঁড়িয়ে আছেন এক ব্যক্তি। ম্যাচের পুরো ৯০ মিনিট এমনকি অতিরিক্ত সময়ের খেলা হলে টানা ১২৫ মিনিট তিনি এক চুলও নড়েন না। চোখের পলক পর্যন্ত ফেলেন না! চিৎকার বা উদযাপন তো দূরের কথা, শরীরের একটা পেশিও নড়াচড়া করে না তার!
চলতি বিশ্বকাপে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর এই ‘স্ট্যাচু ম্যান’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গেছেন। ৪৯ বছর বয়সী এই ফুটবল ভক্তের আসল নাম মিশেল এনকুকা এমবোলাদিঙ্গা। ইন্টারনেট দুনিয়ায় তিনি ‘স্ট্যাচু ম্যান’ বা ‘লুমুম্বা ভেয়া’ নামে পরিচিত। মরক্কোয় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের (আফকন) সময় প্রথম বিশ্ববাসীর নজরে আসেন তিনি। ক্যামেরার লেন্স বারবার মাঠ ছেড়ে ঘুরে যাচ্ছিল তার দিকে। তার এই অবিশ্বাস্য কাণ্ডের দেখে হতবাক সবাই।
ষাটের দশকের ক্লাসিক স্যুট, ভিন্টেজ চশমা এবং নিখুঁত হেয়ারস্টাইলে মিশেল যখন গ্যালারিতে কাঠের বেদির ওপর দাঁড়ান, তখন মিশেলকে মোমের মূর্তি বলে ভ্রম হওয়াটাই স্বাভাবিক। ২০১৩ সাল থেকে প্রতিটি ম্যাচে এই কাজ করে আসছেন তিনি। এবার কঙ্গো দলের ফুটবলারদের বিশেষ অনুরোধে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন সম্পূর্ণ নিজস্ব খরচে তাকে বিশ্বকাপে নিয়ে এসেছে। প্রথম দেখায় অনেকের মনে হতে পারে এটি হয়তো কোনো কৌতুক কিংবা সস্তা প্রচারণামূলক স্টান্ট; কিন্তু মিশেল তার এই কাজকে পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে দেখেন।
মিশেল তার এই স্থবির থাকার রুটিনকে একটি ‘দেশপ্রেমের মিশন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর পেছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। তিনি আসলে কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী এবং ঔপনিবেশিকতাবিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক প্যাট্রিস লুমুম্বার বিখ্যাত ব্রোঞ্জ মূর্তির অনুকরণে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন। লুমুম্বাকে ১৯৬১ সালে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
ডান হাত আকাশের দিকে তুলে উন্মুক্ত হাতের তালু প্রদর্শন করার মাধ্যমে মিশেল মূলত তার দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সম্মান জানান। কঙ্গোর সমর্থকদের মতে, তার এই খোলা হাত নিজ জন্মভূমির জন্য একটি শান্তির প্রতীকও বটে। তবে উত্তর আমেরিকার এই তীব্র গরমের মধ্যে পানির এক ফোঁটা চুমুক না দিয়ে, টানা দুই ঘণ্টা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা যে কতটা শারীরিক ও মানসিক কষ্টের, তা কেবল মিশেলই জানেন।
পাশাপাশি গ্যালারিতে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করার চেয়ে এই নীরব, অবিচল ধ্যান মাঠের খেলোয়াড়দের আধ্যাত্মিক এবং মানসিক শক্তি জোগায় বলে বিশ্বাস মিশেলের। মাঠে যখন দলের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি হয়, তখন নিজের দলকে মানসিকভাবে শক্ত রাখতে তিনি নিজে পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। মিশেলের ভাষায়, ‘এটি কোনো তামাশা নয়, এটি আমার দেশের জন্য এক আধ্যাত্মিক মিশন। আমি স্থির থেকে মাঠের ছেলেদের কাছে শক্তি পাঠাই।’








