বিশ্লেষণ
হরমুজ আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের নতুন শর্ত, পরিণতি কী?

প্রতীকী ছবি- এআই
যুদ্ধ থামানোর কথা ছিল, কিন্তু শান্তির টেবিলে বসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যেন উল্টো একে অন্যের সামনে আরও বড় হিসাবের খাতা খুলে বসেছে। পাঁচ মাসের যুদ্ধের পর আলোচনার কেন্দ্রে এখন একটি সরু জলপথ। হরমুজ প্রণালি। এই পথ খুলবে কি না, তার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ক্ষতিপূরণ, অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার এমনকি বহু পুরোনো সংঘাতের দায়ও। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে ইরানকে বিভিন্ন প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির জন্য অর্থ দিতে। আর ইরানের দাবি, আগে বন্ধ করতে হবে মার্কিন হুমকি ও হামলা, তুলে নিতে হবে নৌ-অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা এবং ফেরত দিতে হবে জব্দ করা সম্পদ। ফলে যে জলপথ দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন হতো, সেটিই এখন হয়ে উঠেছে শান্তির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। আর আলোচনার টানাপোড়েনে তেলের দামও লাফিয়ে উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্ত নিয়ে নতুন করে পাল্টাপাল্টি দাবি তুলেছে। এতে পাঁচ মাসের যুদ্ধ শেষ করে একটি বৃহত্তর শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা সরাসরি আলোচনায় অংশ নিচ্ছে। তবে ইরানের দাবি, তারা কেবল ওমানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছে। গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ভবিষ্যৎ পরিচালনার দায়িত্ব ওমানের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে তেহরান। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, কয়েক দশক ধরে সংঘাত ও হামলার ঘটনায় মৃত্যু ও আহত হওয়ার জন্য ইরানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ দাবি করবেন তিনি। গত সপ্তাহে ইরানও যুদ্ধের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করে নতুন কিছু শর্ত দিয়েছিল। তারা জানিয়েছিল, ওয়াশিংটন তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলবে না।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হরমুজ প্রণালির বিষয়টির সমাধান না হওয়া পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে বৃহত্তর শান্তি আলোচনা আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তেহরান থেকে আলজাজিরার তৌহিদ আসাদি বললেন, ‘দুই পক্ষ আরও দূরে সরে গেছে। কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে।’
সাম্প্রতিক এসব ঘটনা হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ পরিচালনা নিয়ে তেহরান ও ওমানের আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। যদিও এর আগে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই যুদ্ধের অবসানে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর আগ্রহের কথা জানিয়েছিল।
‘ক্ষতিপূরণ’ নিয়ে কী বলেছেন ট্রাম্প?
ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের কর্মকাণ্ডে নিহত বা গুরুতর আহত ব্যক্তিদের জন্য ইরানকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বললেন, ‘৫০ বছর ধরে তারা যে ক্ষতি করেছে, তার জন্য আমরা অর্থ চাইব। তাই যদি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মতো ক্ষতি হয়ে থাকে, আমি মনে করি ইরানকেই সেই ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ২০০০ সালের অক্টোবরে ইয়েমেনে নৌযান ইউএসএস কোল-এ হামলায় নিহত ১৭ মার্কিন নাবিকের পরিবারকেও ইরানের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত। তবে ওই হামলার জন্য ইরানকে নয়, আল-কায়েদাকে দায়ী করা হয়েছিল।
জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় নিহত ইরানি বিক্ষোভকারীদের পরিবারের জন্যও ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তিনি।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এ ছাড়া ইরান নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও গাজার মানুষের ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর জন্যও ইরানকে দায়ী হতে হবে।’
ইরান চলতি বছরের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তেহরানের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ দেওয়া উচিত বলে দাবি করার পর ট্রাম্প এসব শর্ত তুলেছেন।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ কঠোর অবস্থান তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়েছে। শনিবার ভ্যান্স বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়ে তিনি আশাবাদী এবং এ চুক্তি মার্কিন জনগণের জন্য ভালো হবে।
ভ্যান্স আরও বলেছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে শুল্ক আরোপের ‘কোনো পরিকল্পনা’ তাদের নেই। দুই পক্ষের বিরোধের অন্যতম বিষয় ছিল এটি।
তবে ট্রাম্পের নতুন দাবির পর সোমবার তেলের দাম ৫ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। মঙ্গলবারও দাম বাড়ে, কারণ সমঝোতায় পৌঁছানোর আশা ফিকে হয়ে আসে।
ইরানের নতুন দাবিগুলো কী?
ইরান বলেছে, যুদ্ধ শুরুর পরপরই কার্যত জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের কয়েকটি পদক্ষেপের ওপর। এর মধ্যে নতুন কিছু শর্ত মেনে নেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।
শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ ছয়টি নতুন শর্ত ঘোষণা করেছে। সেগুলো হলো—
- ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও অপমানজনক বক্তব্য বন্ধ করতে হবে।
- ইরান এবং লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকে তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে হামলা স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে।
- ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং ইরানের আশপাশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ ও বিমানবাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে।
- ইরান যাকে দুটি ‘চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ’ বলে উল্লেখ করেছে, সেগুলোতে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধ এবং ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধ, যাতে যুক্তরাষ্ট্রও অংশ নিয়েছিল।
- যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে।
- কোনো শর্ত ছাড়াই জব্দ থাকা ইরানের সম্পদ ছেড়ে দিতে হবে।
এদিকে ইরান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে নতুন জাহাজ চলাচলব্যবস্থা নিয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে। নতুন এই ব্যবস্থায় জাহাজ চলাচলের নতুন পথ নির্ধারণ করা হবে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির মতে, আলোচনা এখন ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ রয়েছে।
আরাঘচি রবিবার আবারও ইরানের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনা হচ্ছে না। তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শান্তি আলোচনার জন্য এর অর্থ কী?
বিশ্লেষক নেগার মোরতাজাভির মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার অবস্থান আরও কঠোর হচ্ছে। এতে বৃহত্তর শান্তি সমঝোতায় কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, হরমুজ প্রণালি এবং এটি কীভাবে পরিচালিত হবে, এ বিষয়ে সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বৃহত্তর চুক্তি নিয়ে আলোচনা আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আন্তর্জাতিক নীতি কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ ফেলো মোরতাজাভি আলজাজিরাকে বললেন, ‘গুরুতর আলোচনা শুরুর আগেই উভয় পক্ষ সর্বোচ্চ মাত্রার দাবি তুলছে বলে মনে হচ্ছে।’
তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ অবস্থান বিশেষভাবে স্পর্শকাতর।
মোরতাজাভি আরও বললেন, ‘ট্রাম্পের নতুন দাবিগুলো বিশেষভাবে সমস্যাজনক। কারণ, এতে বর্তমান সংঘাতের অবসানের বাইরের বিষয়গুলোও যুক্ত হয়েছে। বিক্ষোভ ও অতীতের অন্যান্য ঘটনার ক্ষতিপূরণ যদি কেবল আলোচনার অবস্থান না হয়ে সত্যিকার অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সমঝোতার শর্ত হয়ে ওঠে, তাহলে তেহরানের পক্ষে চুক্তি মেনে নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়তে পারে।’
অন্যদিকে তেহরানও উল্লেখযোগ্য কিছু নিশ্চয়তা চাইছে বলে তিনি জানান। শুধু যুদ্ধ বন্ধের নিশ্চয়তা নয়, ‘সংঘাত যাতে পরে আবার শুরু না হয়, তার নিশ্চয়তা এবং যুদ্ধের পর অর্থনৈতিক স্বস্তি’ও চাইছে ইরান।
এর আগে তেহরান জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের আলোচকদের ওপর তাদের আস্থা কমে গেছে। কারণ, আগের আলোচনা চলার সময়ই যুক্তরাষ্ট্র তিনবার ইরানের ওপর হামলা চালিয়েছে।
তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক হোসেইন রয়ভারানের মতে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থার অবসান শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে কোন পক্ষ বেশি সময় ধরে চাপ সহ্য করতে পারে, তার ওপর।
তিনি আলজাজিরাকে বললেন, ‘এখন সমীকরণটা হলো: বন্ধ করে রাখা বনাম অবরোধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে আগে চিৎকার করে উঠবে?’
রয়ভারান আরও বললেন, ‘এই মুহূর্তে আমেরিকা পেট্রলের দাম, মূল্যস্ফীতি এবং দেশের অভ্যন্তরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ভুগছে। এই যুদ্ধ এবং এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে আমেরিকার ভেতরে গভীর অসন্তোষ রয়েছে।’
তিনি যোগ করেন, ‘ইরানের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে ইরানে এমন কিছু যুক্তি রয়েছে, যা সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য। সেটি হলো, এই যুদ্ধ ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং নিজেদের রক্ষার জন্য ইরানের সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না।’






