কেপ ভার্দেতে জন্ম, খেলেছেন আর্জেন্টিনায়

সংগৃহীত ছবি
কিছু ম্যাচ ফুটবলের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। আদ্রিয়ানো কুস্তোদিও মেন্দেসের কাছে বিশ্বকাপের রাউন্ড অব থার্টি টু-তে আর্জেন্টিনা ও কেপ ভার্দের এই লড়াই এক অমীমাংসিত দ্বন্দ্বের নাম। জন্ম কেপ ভার্দেতে হলেও পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনায় বসবাস করছেন এই সাবেক ফুটবলার। তিনি আর্জেন্টিনায় খেলা প্রথম আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়, যিনি দুই দেশের মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী এক জায়গা তৈরি করেছেন। ইনফোবায়েকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেন্দেস স্বীকার করেন, একটি ফুটবল ম্যাচ যে তার হৃদয়কে দ্বিখণ্ডিত করে দিতে পারে, তা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি।
মাত্র ১২ বছর বয়সে ১৯৭৪ সালে আর্জেন্টিনায় পা রাখেন মেন্দেস। তার চার বছর আগে বাবার মৃত্যু তার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয় এবং তাকে নিয়ে যায় প্রবাসে। সেখানে তিনি এমন এক বোনের সঙ্গে মিলিত হন, যাকে তিনি কখনো চোখেও দেখেননি। স্প্যানিশ ভাষা না জানা এবং শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণার মধ্যেই তিনি নতুন করে জীবন শুরু করার আশ্রয় খুঁজে পান ফুটবলে।
সেই পথ তাকে নিয়ে যায় এস্তুদিয়ান্তেস দে লা প্লাতার যুব দলে, যেখানে তিনি কার্লোস বিলার্দোর মতো একজন কোচের সান্নিধ্য পান। বিলার্দো তার ক্যারিয়ারে গভীর প্রভাব ফেলেছিলেন। মেন্দেস স্মরণ করেন, বিলার্দোর কাছে তিনি ছিলেন স্পঞ্জের মতো— কৌশল, রণনীতি ও খেলার খুঁটিনাটি সবকিছু শিখেছেন তার কাছ থেকে। প্রায় ৩৮ বছর বয়স পর্যন্ত খেলে যাওয়ার পেছনে বিলার্দোর শিক্ষারই বড় অবদান বলে মনে করেন তিনি। এরপর তিনি খেলেছেন তেম্পের্লে, কোলন, সান মার্তিন দে তুকুমান ও চাকারিতার হয়েও।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আর্জেন্টিনা তার কাছে শুধু প্রবাসস্থল থেকে আরও বেশি কিছু হয়ে ওঠে। সেখানেই তিনি ক্যারিয়ার গড়েছেন, সংসার পেতেছেন, সন্তানদের জন্ম দিয়েছেন। তবু কেপ ভার্দের সঙ্গে সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি। আজ দুই জাতীয় দলের এই ম্যাচে সেই দ্বৈত সত্তাই আবার প্রকাশ পাচ্ছে।
এক বছর আগেই তিনি এই অনুভূতির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। যখন দুই দেশের একটি কাল্পনিক ম্যাচের কথা ভেবেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নিল। তখন টিওয়াইসি স্পোর্টসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘৫১ বছর ধরে আর্জেন্টিনায় আছি, এই দেশই আমার আপন, এই দেশের জন্য আমি জীবনও দিতে পারি। আমার সন্তানরাও আর্জেন্টাইন। কিন্তু শিকড় তো শিকড়ই। আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দে ম্যাচ হলে আমি কেপ ভার্দের পক্ষেই গলা ফাটাবো। আর্জেন্টিনা আমাকে যা দিয়েছে তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ, কিন্তু জন্মভূমির কথা কখনো ভোলা যায় না।‘
৯ বছর আগে স্থায়ীভাবে আফ্রিকার এই দেশে ফিরে গেলেও আর্জেন্টিনার সঙ্গে সম্পর্ক কখনো ছিন্ন করেননি মেন্দেস। তার ভাষায়, কেপ ভার্দে তাকে জীবন দিয়েছে, এটাই তার রক্ত ও শিকড়; কিন্তু আর্জেন্টিনা তাকে দিয়েছে সবকিছু। আর্জেন্টিনায় তিনি বড় হয়েছেন, সন্তানদের জন্ম দিয়েছেন, ক্যারিয়ার গড়েছেন। নিজের শিকড়ের বিরুদ্ধে যেমন তিনি যেতে পারেন না, তেমনি যে দেশ তাকে আশ্রয় দিয়ে তার জীবন বদলে দিয়েছে তার বিরুদ্ধেও যেতে পারেন না। এই কথাগুলোই যেন প্রতিফলিত করে এমন একজন মানুষের অনুভূতি, যিনি দুটি ঘর খুঁজে পেয়েছেন এবং এখন বিভক্ত হৃদয় নিয়ে একটি বিশ্বকাপের সাক্ষী হচ্ছেন।




