ফুটবলের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক লাইজু

কুড়িগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে প্রশিক্ষণ দেন জালাল হোসেন লাইজু। ছবি: আগামীর সময়
দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র ফরহাদ হোসেন ফাহিমের বাবা পেশায় অটোরিকশাচালক। সংসারে অভাব থাকলেও ফাহিমের ইচ্ছা বড় হয়ে জাতীয় দলে খেলা। এই লক্ষ্য নিয়ে সে যোগ দিয়েছে লাইজু কিডস্ ফুটবল একাডেমিতে। ফাহিমের সঙ্গে অন্যদের মতো প্রশিক্ষণ নেয় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু সাঈদও। দরিদ্র পরিবারের সন্তান সাঈদও চায় ভালো ফুটবলার হতে।
ফাহিম সাঈদের মতো অনেক খুদে ফুটবলারের স্বপ্ন পূরণে কাজ করছেন জালাল হোসেন লাইজু (৬৬)। শুভাকাঙ্ক্ষী ও ক্রীড়ানুরাগীদের সহযোগিতা আর নিজের অর্থ, শ্রমে ২০১৬ সালে গড়ে তুলেছেন কুড়িগ্রামের একমাত্র ফুটবল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ‘লাইজু কিডস্ ফুটবল একাডেমি’। এখানে ফুটবল প্রশিক্ষণ নিতে টাকা লাগে না, প্রতিদিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় অন্তত ৩ ঘণ্টা।
লাইজুর বাবা মনির হোসেন ছিলেন জেলার পরিচিত ফুটবলার। খেলাধুলার পরিবেশেই বেড়ে উঠেছেন লাইজু। বাবার অনুপ্রেরণায় অল্প বয়সেই বিভিন্ন স্কুল-কলেজে আয়োজন করেছেন ফুটবল টুর্নামেন্টের। পড়াশোনা করেছেন কুড়িগ্রাম সরকারি বালক বিদ্যালয়, কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ, রংপুরের কারমাইকেল কলেজ এবং পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশোনা শেষে ঢাকায় দীর্ঘদিন বিভিন্ন পোশাক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর ২০১৫ সালে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে অবসর নেন।
‘একটি বল, একটি গ্রাম, ফুটবলের নগরী কুড়িগ্রাম’— স্লোগান নিয়ে শুরু হওয়া তার প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের যাত্রাটা ছিল একেবারেই সাদামাটা। প্রতিষ্ঠানের ছিল না নিজস্ব মাঠ, ছিল না নির্ভরযোগ্য কোনো পৃষ্ঠপোষক। তবে স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। প্রতিদিন কুড়িগ্রাম জেলা স্টেডিয়ামে প্রশিক্ষণ চলে। প্রতি শনিবার জেলার বাইরে থেকেও আসেন খেলোয়াররা। কেউ আসেন প্রশিক্ষণ নিতে, আবার কেউবা প্রিয় স্যার লাইজুর সঙ্গে দেখা করতে। বর্তমানে এখানে নিয়মিত প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন শতাধিক খেলোয়াড়। ১০ থেকে ২৮ বছর বয়সীদের এখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। জেলায় এই প্রতিষ্ঠানের ১০০টি গোল্ডেন স্পটেও চলে ফুটবল প্রশিক্ষণ। সব মিলিয়ে হাজারখানেক শিশু-কিশোর-তরুণ নিচ্ছে প্রশিক্ষণ।
এই একাডেমিতে শুধু ফুটবল প্রশিক্ষণই নয় অনেক শিশুকে দেওয়া হয় বই-খাতা, কারও পড়াশোনার খরচ, আবার কাউকে কিনে দেওয়া হয় জার্সি কিংবা বুট।
একাডেমির সভাপতি ও প্রশিক্ষক জালাল হোসেন লাইজু। প্রশিক্ষণের ফাঁকে কথা হয় তার সঙ্গে। বললেন, তিনি ভালো ফুটবলার না হলেও ভালো ফুটবল ব্যবস্থাপক হওয়ার চেষ্টা করছেন। দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে যারা ফুটবলার হওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি শুধু তাদের ফুটবল ব্যবস্থাপনা শেখাচ্ছেন।
লাইজু জানালেন, শুভাকাঙ্ক্ষীদের অর্থ ও নিজের উপার্জনের বড় একটি অংশ তিনি ব্যয় করছেন খেলোয়াড়দের পেছনে। মাঝেমধ্যে অনুশীলনের পর খেলোয়াড়দের জন্য ব্যবস্থা করছেন পুষ্টিকর খাবারের। তিনি মনে করেন, জেলার ক্রীড়াপ্রেমী ও সক্ষম মানুষরা যদি এই খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়ান, তাহলে এখান থেকেই উঠে আসবে জাতীয় মানের খেলোয়াড়।
লাইজুর হাত ধরে গড়ে উঠেছে লাইজু কিডস্ ফুটবল একাডেমিসহ এফসি উত্তরবঙ্গ, কুড়িগ্রাম মোহামেডান ফুটবল একাডেমি, জারা-গ্রিন ভয়েস ফুটবল একাডেমি, কিশোর বাংলা ক্লাবসহ অনেক ফুটবল প্রশিক্ষণ একাডেমি।
সম্প্রতি কুড়িগ্রামের চারজন খেলোয়াড় বিকেএসপিতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েছে। দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলোর বয়সভিত্তিক দলে জায়গা করে নিয়েছে কয়েকজন। প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ের ফুটবল টুর্নামেন্টে রংপুর বিভাগের সেরা দলের পেছনেও রয়েছে তার প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান— বলছিলেন লাইজু।
লাইজু কিডস্ ফুটবল একাডেমির প্রশাসনিক পরিচালক বিদ্যুৎ চন্দ্র রায় জানালেন, তারা শুধু ফুটবল প্রশিক্ষণই দেন না। পাশাপাশি কোনো ভালো খেলোয়াড় যদি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাকে নানাভাবে সহায়তা করেন। আর এই কাজটি নীরবে করে যাচ্ছেন জালাল হোসেন লাইজু।




