অজানা উড়ন্ত বস্তু ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের রসওয়েল অঞ্চলে ঘটে যাওয়া রহস্যময় একটি ঘটনার স্মরণে ইউএফও (UFO) দিবস জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে আলোচনা, সেমিনার, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী এবং মহাকাশবিষয়ক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
ইউএফওর পূর্ণরূপ হলো আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্ট, যার বাংলা অর্থ ‘অশনাক্ত উড়ন্ত বস্তু’ বা ‘উড়ন্ত চাকতি’। সহজ কথায়, আকাশে দৃশ্যমান যেকোনো অচেনা-অজানা বস্তু বা আলো, যা পর্যবেক্ষক বা বিশেষজ্ঞরা তাৎক্ষণিকভাবে বা তদন্তের পরও শনাক্ত করতে পারেন না। তবে কোনো বস্তু ইউএফও হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, সেটি ভিনগ্রহের মহাকাশযান। অনেক ক্ষেত্রেই পরে সেগুলোকে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ বেলুন, ড্রোন, সামরিক উড়োজাহাজ কিংবা আলোক প্রতিফলনের ফল হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। বর্তমানে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগও এ ধরনের ঘটনার অনুসন্ধানে ইউএপি (আনআইডেন্টিফাইড অ্যানোম্যালাস ফেনোমেনা) শব্দটি ব্যবহার করছে। তবে এখন পর্যন্ত ভিনগ্রহের প্রাণী পৃথিবীতে এসেছে, এমন দাবির পক্ষে গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি।
এ ধরনের আলোচনায় ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি কী, এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই আসে। ইসলাম মানুষকে কৌতূহলী হতে নিষেধ করে না; বরং জ্ঞান অর্জন, পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণাকে উৎসাহিত করে। পবিত্র কোরআন মানুষকে বারবার মহাকাশ, আকাশমণ্ডলী এবং সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করার আহ্বান জানিয়েছে। আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের পরিবর্তনে বোধসম্পন্ন মানুষের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯০)। অন্য এক আয়াতে মহান আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘তুমি পরম করুণাময়ের সৃষ্টিতে কোনো অসামঞ্জস্য দেখতে পাবে না। আবার দৃষ্টি ফিরিয়ে দেখো, কোনো ত্রুটি দেখতে পাও কি?’ (সুরা মুলক, আয়াত: ৩-৪)। এসব আয়াত মানুষকে সৃষ্টির নিখুঁত বিন্যাসের মধ্যে স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করতে উদ্বুদ্ধ করে।
ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো, গায়েব বা অদৃশ্য জগত সম্পর্কে সীমালঙ্ঘন না করা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতাআলা বলেছেন, ‘বলুন, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে যারা আছে, তারা কেউই গায়েব জানে না, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া।’ (সুরা নামল, আয়াত: ৬৫)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমাদেরকে জ্ঞান অতি সামান্যই দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৮৫)। তাই কোনো অজানা উড়ন্ত বস্তু দেখেই সেটিকে ভিনগ্রহের যান, জিনের আবাস কিংবা অলৌকিক ঘটনা বলে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে আসা যায় না। তবে এসব নিয়ে একজন মুসলিম গবেষণা করতে পারে সত্য জানার খাতিরে।
ইসলাম মানুষকে কৌতূহলী হতে নিষেধ করে না; বরং জ্ঞান অর্জন, পর্যবেক্ষণ এবং গবেষণাকে উৎসাহিত করে
অনেকে প্রশ্ন করেন, পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব থাকলে ইসলাম কি তা অস্বীকার করে? পবিত্র কোরআন এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে হ্যাঁ বা না কোনোটিই বলেনি। সুরা শুরার ২০নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তার নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং এতদুভয়ের মধ্যে তিনি যেসব জীবজন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি যখন ইচ্ছা তাদের একত্র করতে সক্ষম।’ এ আয়াতের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো মুফাসসির আকাশমণ্ডলীতে অন্য কোনো প্রাণের সম্ভাবনার আলোচনা করেছেন, আবার অনেকে এ আয়াতকে ফেরেশতাসহ আল্লাহর বিভিন্ন সৃষ্টির প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাই এটি ভিনগ্রহের প্রাণের নিশ্চিত প্রমাণ নয় আবার এ ধারণাকে উড়িয়ে দেওয়াও যায় না।
ইউএফও দিবস আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষ যতই প্রযুক্তিতে অগ্রসর হোক, মহাবিশ্বের অসংখ্য রহস্য এখনো অজানা। এই অজানাকে কেন্দ্র করে কল্পনা নয়, বরং গবেষণা, সততা এবং সত্য অনুসন্ধানই হওয়া উচিত একজন মুসলিমের পথ। একজন মুসলিম বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সত্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে জ্ঞান অর্জনকে ইবাদতের অংশ মনে করেন। আর অন্তরে লালন করেন যে, মানুষের জ্ঞানের সীমা আছে এবং সর্বজ্ঞ একমাত্র মহান আল্লাহতাআলা।
কাজেই অজানা উড়ন্ত বস্তু নিয়ে কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক, গবেষণাও প্রয়োজন। পবিত্র কোরআনের আলোকে একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো সৃষ্টিজগত নিয়ে চিন্তা করা, জ্ঞান অর্জন করা, সংবাদ যাচাই করা এবং সর্বোপরি আল্লাহর অসীম জ্ঞান ও ক্ষমতার সামনে নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




