প্রকৃতি ধনী-গরিব দেখে না

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
জলবায়ু পরিবর্তন ও সুপার এল-নিনোর প্রভাবে এ বছর গরমের তীব্রতা রেকর্ড ছাড়িয়েছে। শুধু দেশেই নয়, বৈশ্বিক আবহাওয়াও উত্তপ্ত। ইউরোপ পুড়িয়ে গরম ছুটছে এবার যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মুখে পড়তে যাচ্ছে মার্কিনিরা। এটি শুধু মার্কিন জনজীবনের জন্য বিপর্যয়ের বার্তা নয়, বিশ্বের নানা দেশের জন্যও জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব পড়বে। এই বিপদ সামলে উঠতে উন্নত বিশ্ব তাদের সামর্থ্য দিয়ে চেষ্টা করবে। কিন্তু আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ কীভাবে তা মোকাবিলা করবে, তা মহাদুশ্চিন্তার বিষয়।
একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় এবং নিষ্ঠুর সত্যের নাম জলবায়ু পরিবর্তন। এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের নির্মম বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে আজ পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল বদ্বীপ বাংলাদেশ— কেউই প্রকৃতির এই প্রতিশোধ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। তবে এই সংকটের সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, এর জন্য দায়ী রাষ্ট্রগুলো যখন শুধু আরামদায়ক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, তখন এর চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে বাংলাদেশের মতো নিরীহ দেশগুলোকে।
সভ্যতার আত্মঘাতী সংকট শিল্পবিপ্লবের পর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানির অবাধ ব্যবহার, নির্বিচারে বন উজাড় এবং গ্রিনহাউজ গ্যাসের (কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ইত্যাদি) অতিরিক্ত নিঃসরণ পৃথিবীকে একটি উত্তপ্ত চুল্লিতে পরিণত করেছে। বিজ্ঞানীরা একেই বলছেন বৈশ্বিক উষ্ণতা। প্রকৃতির একটি নিজস্ব ভারসাম্য থাকে, কিন্তু সীমাহীন লোভ সেই ভারসাম্য ভেঙে দিয়েছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এবং ঋতুচক্র হচ্ছে বিপর্যস্ত। এটি কোনো একক দেশের সমস্যা নয়, বরং মানবসভ্যতার অস্তিত্বের সংকট। পশ্চিমা বিশ্বে বহমান তাপপ্রবাহকে প্রকৃতির নির্মম প্রতিশোধ হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্ব একসময় ভাবত জলবায়ু পরিবর্তন শুধু দরিদ্র দেশগুলোর সমস্যা, আজ তারাও প্রকৃতির রুদ্ররূপের মুখোমুখি। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা নিয়মিত বিপর্যয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাত্রাতিরিক্ত গরম এবং শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে প্রতি বছর দেশটির বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। বিলীন হচ্ছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি। পাশাপাশি স্পেনে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহে ১ হাজার ২৮ জনের মৃত্যু আরও ভয়ংকর বার্তা বহন করছে।
বৈশ্বিক উষ্ণতার নেপথ্যে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য। অথচ, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ঘনবসতির কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী বাংলাদেশও। এর প্রভাব বহুমুখী। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশ পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। প্রায় ২ কোটি মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে ‘জলবায়ু উদ্বাস্তু’ হতে বাধ্য হবে। সমুদ্রের নোনাপানি দেশের অভ্যন্তরে ঢুকে ফসলিজমির ক্ষতি করে খাদ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলবে। বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্যের চিরচেনা রূপও এখন আর নেই। অামাদের বর্তমান প্রজন্ম জলবায়ু বিপর্যয় বা এর ক্ষয়ক্ষতি সয়ে গেল। কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম যে আরও দুর্বিষহ কষ্ট ও বিপর্যয়ের মুখোমুখি হবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। ভবিষ্যৎ বিবেচনা করে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবানল আর বাংলাদেশের বন্যা একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। পরিস্থিতি উত্তরণের প্রধান পন্থা সবাইকে সচেতন ও প্রকৃতি-সংলগ্ন হওয়া। আর বাংলাদেশকে বনায়ন বৃদ্ধি ও জীবাশ্ম জ্বালানি রোধে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়াই হবে সমীচীন। উন্নত বিশ্বের নেতাদেরও এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে প্রকৃতির প্রতিশোধ থেকে তারা এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্ম রেহাই পাবেন না, তা নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে।




