নারীর রাজনৈতিক বৈধতা ভাঙার চেষ্টা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বর্তমানে রাজনীতিতে নারী নেত্রীদের দুর্বল করতে তাদের বিরুদ্ধে গুজব ও কুৎসা রটানোর চেষ্টা চলছে। নিকট অতীতে তাকালে এরকম একটি উদাহরণ আমরা দেখতে পাই। কুষ্টিয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য এবং ধর্মীয় বক্তা মুফতি আমির হামজা এক ওয়াজ মাহফিলে দাঁড়িয়ে সংসদ সদস্য ও আইনবিদ রুমিন ফারহানাসহ অন্য নারী এমপিদের শরীর, অবয়ব এবং ব্যক্তিত্ব নিয়ে অত্যন্ত কুৎসিত, অশালীন মন্তব্য ও বডি শেমিং করেন। রুমিন ফারহানা যখন সংসদে দাঁড়িয়ে এবং অনলাইনে এর তীব্র প্রতিবাদ জানান, তখন জামায়াত বা ওই বিশেষ রাজনৈতিক মহলটি সম্পূর্ণ নীরব থাকে।
পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতাব্যবস্থার মৌলিক অনুমানটিই হলো নারী নিজস্ব রাজনৈতিক সক্ষমতার অধিকারী হতে পারে না। ফলে নারীর উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মেধার পরিবর্তে যৌনতার ভাষা বা শারীরিক অবয়বের ট্রল ব্যবহার করা হয়। চরিত্রহনন এবং এ ধরনের অনলাইন-অফলাইন আক্রমণ ও সহিংসতার হুমকি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে উল্লেখযোগ্যভাবে নিরুৎসাহিত ও স্থবির করে ফেলে। এর মাধ্যমে সমাজে একটি পদ্ধতিগত বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে— নারী যতই যোগ্য হোক না কেন, জনজীবনে প্রবেশ করলে তার রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে তার শরীরই অধিকতর আলোচ্য এবং আক্রমণযোগ্য হয়ে উঠবে।
রুমিন ফারহানার এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার আরেকটি রূপ উন্মোচিত হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের আলোচনা চলাকালে বিএনপির সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী যখন বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নারী এমপিদের নেকাব ও মুখমণ্ডল ঢাকা পোশাক নিয়ে সংসদে চটুল এবং উপহাসমূলক মন্তব্য করেন, তখন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন মেরূকরণ তৈরি হয়। জামায়াত এবং তাদের সমমনা দলগুলো এই মন্তব্যকে তাদের ধর্মীয় অনুভূতির ওপর আঘাত এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার খর্ব হিসেবে গণ্য করে তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে (যা পরবর্তী সময়ে স্পিকার এক্সপাঞ্জ করতে বাধ্য হন)।
চরিত্রহনন এবং এ ধরনের অনলাইন-অফলাইন আক্রমণ ও সহিংসতার হুমকি নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে উল্লেখযোগ্যভাবে নিরুৎসাহিত ও স্থবির করে ফেলে
এই ঘটনাটি রাজনৈতিক দলগুলোর ‘সিলেক্টিভ মোরালিটি’ বা সুবিধাবাদী নৈতিকতাকে নগ্নভাবে প্রকাশ করে। জামায়াত ও তাদের বিশেষ রাজনৈতিক মহলটি নিজেদের দলের নারীর পোশাকের স্বাধীনতার প্রশ্নে যতটা সরব ও অধিকারসচেতন ভূমিকা পালন করেছিল, রুমিন ফারহানার মতো প্রগতিশীল নারী রাজনীতিকের বডি শেমিং ও চরিত্রহননের বেলায় তারা ততটাই নিশ্চুপ ছিল।
অন্যায়ের প্রতিবাদ যখন ভুক্তভোগীর মুখ, দল কিংবা পোশাকের রঙ দেখে নির্ধারিত হয়, তখন প্রতিবাদ তার নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা হারায়। এই বিশেষ মহলটি নীরব থেকে পরোক্ষভাবে সমাজে এই বার্তাই দিতে চায়— যেহেতু নির্দিষ্ট কিছু নারী তাদের ধর্মীয় বা নির্দিষ্ট পোশাকের অনুশাসন পুরোপুরি মানেন না, তাই তাদের নিয়ে ট্রল বা বডি শেমিং হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। এটি ক্ষমতার লড়াইয়ের এমন এক প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক বৈধতাকে ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
নারী রাজনীতিবিদের এই শ্রেণিগত, ধর্মীয় এবং সামাজিক অবস্থানের জটিল মনস্তত্ত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে জামায়াতের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিনের ‘মাহরাম বিতর্ক’র মধ্য দিয়ে। এর আগে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক নারী যখন হেনস্তার শিকার হন, তখন সামান্তা শারমিন মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘ওই নারী যেহেতু মাহরাম (পুরুষ অভিভাবক) ছাড়া সেখানে গিয়েছিলেন, তাই তিনি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।’ একজন তরুণ নারী নেত্রী হয়েও নিপীড়িত নারীর পাশে না দাঁড়িয়ে উল্টো ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করার এই যে ‘ভিকটিম ব্লেমিং’ (Victim Blaming), তা মূলত কট্টরপন্থী সঙ্গীদের খুশি করার এক রাজনৈতিক চতুরতা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।
পরে একটি বহুল আলোচিত অনলাইন টকশোতে উপস্থাপক যখন তার এই স্ববিরোধী অবস্থানের সূত্র ধরে সরাসরি প্রশ্ন করেন যে— তিনি আসলেই নারীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন নাকি নারীদের ঘরের বাইরে বের হতে ‘মাহরাম’ নেওয়ার প্রথাকে সমর্থন করেন, তখন তিনি বিষয়টি চতুরতার সঙ্গে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এটি রাজনীতিতে এক পরম আদর্শিক ফাঁদ (Ideological Trap)। কারণ, ‘হ্যাঁ’ বললে তার দল ও জোটের কট্টরপন্থীদের রোষানলে পড়তে হতো আর ‘না’ বললে নিজের আধুনিক মুখোশটি উন্মোচিত হয়ে যেত। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে, রাজনীতি ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব কীভাবে নারীর শরীর ও স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণের সমীকরণে ব্যবহার করে।
সামান্তা শারমিনের এই ‘সুবিধাবাদী’ অবস্থানের চূড়ান্ত পরিণতি দেখা যায় যখন জামায়াত-এনসিপির একটি যৌথ আয়োজনে মঞ্চের ওপর পুরুষ নেতারা এবং নিচের ধাপে নারী নেতাদের বসার একটি আসনবিন্যাস তৈরি করা হয়। এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে সামান্তা নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি শেয়ার করে লিখলেন— ‘Visual representation of First Class and Second Class citizens of NCP. ব্যাটাগিরি মুর্দাবাদ।’
কিন্তু এবার আর নেটিজেনরা তার এই ‘বিপ্লবী’ রূপে গলেনি। নেটিজেনরা তাকে আয়না দেখিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন, যে কট্টরপন্থী ব্যবস্থার সুরে সুর মিলিয়ে তিনি অন্য নারীর স্বাধীনতাকে ‘সীমাবদ্ধ’ করতে চেয়েছিলেন, আজ সেই একই ব্যবস্থার কাঠামোগত বৈষম্য যখন তার নিজের ওপর দৃশ্যমান হলো, তখন তিনি একে ‘ব্যাটাগিরি’ বলে চিৎকার করছেন। জামায়াত তার নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শে অটল; তারা যা বিশ্বাস করে, তা-ই চর্চা করছে। কিন্তু সমস্যা সেইসব সুবিধাবাদী রাজনীতিকের, যারা ভোটের স্বার্থে প্রথমে কট্টরপন্থার চাদর গায়ে জড়ান এবং পরে নিজের অধিকার খর্ব হলে লিঙ্গ সমতার কার্ড খেলেন।
দক্ষিণ এশিয়ার, বিশেষত বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নারীর বিরুদ্ধে যৌন ইঙ্গিত, চরিত্রহনন বা নৈতিক অপবাদকে প্রায়ই রাজনৈতিক সমালোচনার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। অথচ বাস্তবে এসব ভাষা কোনো রাজনৈতিক মতবিরোধের সুস্থ প্রকাশ নয়; বরং এটি হলো নারীকে স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অক্ষম একটি সুনির্দিষ্ট পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতাব্যবস্থার বহিঃপ্রকাশ। সরাসরি বললে, এগুলো হলো কুৎসিত ‘ব্যাটাগিরি’। যে সমাজ নারীর সাফল্যকে তার মেধা ও রাজনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়, সেই সমাজ শেষ পর্যন্ত যৌনতা ও শরীরকেই ক্ষমতার একমাত্র বোধগম্য ভাষা হিসেবে ব্যবহার করে।
মহাভারতে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ শুধু একজন নারীর অপমান ছিল না। ছিল ক্ষমতা, প্রতিশোধ ও রাজনৈতিক আধিপত্যের প্রকাশ। সমকালীন রাজনীতিতেও নারী নেত্রীদের বিরুদ্ধে চরিত্রহনন, যৌন কুৎসা ও নৈতিক বিচার একই ধরনের প্রতীকী ‘বস্ত্রহরণ’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যেখানে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার জন্য গুজব, কুৎসা, চরিত্রহনন ও সামাজিক লজ্জা উৎপাদনের মাধ্যমে নারীকে প্রতীকীভাবে বিবস্ত্র করা হয়। দূতসভায় উপস্থিত কৌরবের অন্নদাস প্রবীণ ও বীর যোদ্ধারা নীরবতা অবলম্বন করলেও দ্রৌপদীর প্রতি অন্যায় অপমানের তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন কৌরব শিবিরের বিকর্ণ, দুরযোধনের ভাই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে নারীর প্রতি অন্যায় অপমান ও সহিংসতার বিরুদ্ধে নিজস্ব দলমতের বাইরে গিয়ে নির্মোহভাবে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করার মানুষ ক্রমেই প্রত্নতাত্ত্বিক সামগ্রীতে পরিণত হচ্ছে। যতদিন না রাজনৈতিক দলগুলো নারীকে শুধু একটি ‘নিয়ন্ত্রিত ও মূল্যায়নযোগ্য দেহ’ ভাবা বন্ধ করে একজন ‘পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক কর্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেবে, ততদিন এই ক্ষমতার মঞ্চে নারীর সম্মান দাবার ঘুঁটি হিসেবেই ব্যবহৃত হতে থাকবে।
লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মী





