পেলে-ম্যারাডোনার আজতেকায় ইংল্যান্ডের অগ্নিপরীক্ষা

পেলের বিশ্বকাপ জয় কিংবা ম্যারাডোনার সেই 'হ্যান্ড অব গড' গোলের স্মৃতিবিজরিত স্টেডিয়াম আজতেকা।
বিশ্ব ফুটবলের যত বিখ্যাত স্টেডিয়াম আছে, সেগুলোর অন্যতম মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকা। পাহাড়বেষ্টিত উপত্যকায় অবস্থিত নয়নাভিরাম এই স্টেডিয়ামেই প্রাণ পায় ফুটবলের আসল রং, দর্শকদের উন্মাদনা আর গ্যালারির গর্জন। এখানেই বিশ্বজয়ের মুকুট পরেছেন ফুটবলের ইতিহাসের দুই অমর সম্রাট- পেলে এবং দিয়েগো ম্যারাডোনা। সেই মাঠেই চলতি বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচে মেক্সিকোর মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড। ১৯৭০ সালে পেলের তৃতীয় বিশ্বকাপ জয় কিংবা ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার সেই শতাব্দীসেরা একক গোল—সবই দেখেছে এই আজতেকা। ১৯৮৬ সালে বহুল আলোচিত কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিদায় নেওয়ার এত বছর পর আবারও এই বিশালাকার স্টেডিয়ামে পা রাখছে ইংল্যান্ড দল। ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলে এই স্টেডিয়াম নিয়ে বলেছিলেন, ‘আজতেকার মাঝে অন্যরকম একটা জাদু আছে। এর অনুভূতি বুঝতে হলে আপনাকে এর ভেতরে যেতে হবে।’
আধুনিকায়নের পর বর্তমানে আজতেকার দর্শকধারণ ক্ষমতা কমে দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫০০-তে। তবে এর খাড়া গ্যালারি এবং মাঠের একদম গা-ঘেঁষে থাকা স্ট্যান্ডের কারণে দর্শকদের চিৎকার মাঠে যেন ‘শব্দের সুনামি’ তৈরি করে। কানাডা দলের হয়ে এখানে খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে আসা জেসন ডি ভসের ভাষায়, ‘আজতেকার গ্যালারি পূর্ণ থাকলে মাঠে সতীর্থদের সাথে যোগাযোগ করা অসম্ভব। টানেল দিয়ে যখন আপনি মাঠের দিকে এগোবেন, মনে হবে হাজার হাজার মৌমাছি চারদিকে ভনভন করছে। মাঠে প্রবেশ করলে বুঝবেন, ওটা আসলে দর্শকদের চিৎকার!’ এই স্টেডিয়ামটিই ইতিহাসের একমাত্র ভেন্যু, যা তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপের (১৯৭০, ১৯৮৬ এবং ২০২৬) ম্যাচ আয়োজনের গৌরব অর্জন করেছে। ১৯৭০ সালে ইতালি-জার্মানির মধ্যকার ইতিহাসের অন্যতম সেরা সেমিফাইনাল (৪-৩) কিংবা ফাইনালে কার্লোস আলবার্তোর সেই অবিশ্বাস্য টিম গোল—সবকিছুরই সাক্ষী আজতেকা। ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যারাডোনা তার ফুটবল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিখ্যাত ও বিতর্কিত দুটি গোল (হ্যান্ড অব গড এবং চার ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করা একক গোল) করেছিলেন এই মাঠেই।
আজতেকায় মেক্সিকোর রেকর্ড অবিশ্বাস্য। ঘরের মাঠে খেলা ৮৯টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের মধ্যে তারা জিতেছে ৭০টিতে, ড্র ১৭টি আর হার মাত্র ২টি! ২০০১ সালে কোস্টারিকার কাছে প্রথম হারের ধাক্কা মেক্সিকানদের কাছে এতটাই বড় ছিল যে, দেশটির মিডিয়া একে ‘আজতেকাজো’ (আজতেকার শোক) বা ‘দাফন’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। মাঠের গর্জনের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের জন্য সবচেয়ে বড় শত্রু এখানকার ভৌগোলিক অবস্থান। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার ২০০ মিটারেরও বেশি উঁচুতে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামের বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কম। তাই খেলোয়াড়রা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। উচ্চতার এই ধকল নিয়ে কাজ করা অধ্যাপক ড. অলিভিয়ের জেরার্ড বলেন, ‘উচ্চতার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগে মিডফিল্ডাররা। অনেক সময় দলগুলো প্রবল দাপট নিয়ে এখানে খেলা শুরু করে, কিন্তু প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়েই তারা ক্লান্ত হয়ে যায় এবং ভুল পাসে গোল খাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।’ এই বৈরী কন্ডিশনে ম্যারাডোনা বা পেলের মতো ফুটবলাররা যে অতিমানবীয় ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন, সেটা তাদের শ্রেষ্ঠত্বকে আরও উঁচুতে স্থান করে দেয়।
আজতেকা কেবল ফুটবলের চারণভূমি নয়, সংস্কৃতিরও এক মিলনমেলা। ১৯৯৩ সালে বিশ্বখ্যাত বক্সার জুলিও সিজার চাভেজ এখানে ১ লাখ ৩২ হাজার দর্শকের সামনে বিশ্ব রেকর্ড গড়ে ডব্লিউবিসি শিরোপা ধরে রাখেন। একই বছর পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসন তার ‘ডেঞ্জারাস ওয়ার্ল্ড ট্যুর’-এর টানা পাঁচটি কনসার্ট করেন এখানে। ১৯৯৯ সালে পোপ দ্বিতীয় জন পল এখানে ১ লাখ ১০ হাজার মানুষের এক বিশাল প্রার্থনা সভায় বক্তব্য রাখেন। ফুটবলপ্রেমী পোপ নিজেই বলেছিলেন, ‘এখানে আসা এক পরম সৌভাগ্যের, যেখানে আমি এত সুন্দর ফুটবল উপভোগ করেছি।’











