বিশ্বকাপ
ফিফা ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরে যত ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’

লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার জন্য কি ২০২৬ বিশ্বকাপের ট্রফিটা আগে থেকেই বরাদ্দ করে রাখা হয়েছে? মিশরের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচের পর এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে ফুটবল বিশ্বে। মঙ্গলবার আটলান্টায় মিশরের মোস্তফা জিকোর একটি গোল বাতিল হওয়া এবং ম্যাচের শেষ মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলটি নিয়ে রেফারি ও ভিএআরের সিদ্ধান্তকে ‘পাতানো’ বলে সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন মিশরীয় ফুটবলাররা।
এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ না থাকলেও বিশ্বমঞ্চে অনেককিছুই ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নদের পক্ষে যাওয়ার অভিযোগ তুলে সমালোচকেরা এখন একাট্টা। ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানের নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর এমনিতেই ফিফার সততা সংকটের মুখে। তার ওপর আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের বাড়তি নাটকীয়তা সমালোচনার আগুনে ঘি ঢেলেছে। অনেকের মতে, ফিফার বিশ্বাসযোগ্যতা পড়েছে প্রশ্নের মুখে। আলজেরিয়ার বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে মেসির হ্যাটট্রিক নিয়ে যখন মাতামাতি হচ্ছিল, তখনই শুরু হয় প্রথম বিতর্ক। ম্যাচের ৩২ মিনিটে আলজেরিয়ার অধিনায়ক ঈসা মান্দির পায়ের পেছনের অংশে বুটের স্পাইক দিয়ে আঘাত করেছিলেন মেসি। পোলিশ রেফারি সাইমন মারচিনিয়াক এবং ভিএআর কেউই এটিকে লাল কার্ডের যোগ্য মনে করেননি। অথচ একই ধরণের ফাউল করে বসনিয়ার বিপক্ষে সরাসরি লাল কার্ড দেখতে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের বালোগানকে। সাবেক ম্যানচেস্টার সিটি ডিফেন্ডার নেডাম ওনোহা ইএসপিএনকে বলেন, ‘আমার মতে ওটা নিশ্চিত লাল কার্ড ছিল। মেসি নিজেও জানত সে বড় বাঁচা বেঁচে গেছে।’
শুধু মেসিই নন, পুরো আর্জেন্টিনা দলই কার্ডের দিক থেকে বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে বলেও অভিযোগ। আলজেরিয়ার বিপক্ষে ১৩টি ফাউল করেও কোনো কার্ড দেখেনি তারা। জর্ডানের বিপক্ষেও সাতটি ফাউলের বিপরীতে কোনো কার্ড ছিল না আলবিসেলেস্তেদের। এমনকি মিশর ম্যাচেও ইনজুরি টাইমে গোল দেওয়ার আগে আর্জেন্টিনার কেউ কার্ড দেখেনি। অথচ গোল হজমের পর রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায় মাত্র কয়েক মিনিটে মিশরের চার খেলোয়াড় ও কোচ হোসাম হাসানকে হলুদ কার্ড দেখানো হয়। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা ৮টি দলের মধ্যে আর্জেন্টিনাই দ্বিতীয় সর্বনিম্ন (মাত্র ৩টি) হলুদ কার্ড পেয়েছে, অথচ ফাউল করার দিক থেকে তারা রয়েছে চতুর্থ স্থানে। তারা প্রতি ১৯.৭টি ফাউলে একটি কার্ড দেখেছে, যা কেবল নরওয়ের (২৪) চেয়ে কম। অন্যদিকে ইংল্যান্ড প্রতি ৬.৮টি ফাউলেই কার্ড দেখেছে।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে রাউন্ড অব বত্রিশের ম্যাচে আর্জেন্টিনা যখন ধুঁকছিল, তখন গ্যালারিতে বসা ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আর্জেন্টাইন টেলিভিশনকে বলেন, ‘ম্যাচ চলাকালীন আমি আর্জেন্টিনার জন্য অনেক টেনশনে ছিলাম।’ পরে অবশ্য বেফাঁস মন্তব্য সামাল দিতে তিনি যোগ করেন, ‘মানে আমরা যারা নিরপেক্ষ দর্শক, দুই দলের জন্যই বলছিলাম।’ তবে ফিফা সভাপতির এমন মন্তব্য আর্জেন্টিনার পক্ষে যাচ্ছে বলে অনেকের দাবি। ফ্রান্স বনাম মরক্কো কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের রেফারি প্যানেল নিয়েও তৈরি হয়েছে বিতর্ক। এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে মাঠের প্রধান রেফারি থেকে শুরু করে রিজার্ভ রেফারি—৫ জন অফিশিয়ালের সবাই আর্জেন্টিনার! ফ্রান্সকে যেহেতু এই টুর্নামেন্টে মেসিদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা হচ্ছে, তাই ফরাসিদের ম্যাচে আর্জেন্টাইন রেফারি নিয়োগ দেওয়ার ফিফার এই সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াতেই জন্ম হয়েছে নতুন ষড়যন্ত্রতত্ত্বের।
বিশ্বকাপের বল মাঠে গড়ানোর আগেই ড্রয়ের নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল—ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, স্পেন ও ইংল্যান্ডকে এমনভাবে ড্রয়ের গ্রুপে রাখা হয়েছিল যাতে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হলে সেমিফাইনালের আগে কেউ কারও মুখোমুখি না হয়। ফলশ্রুতিতে আর্জেন্টিনা অত্যন্ত সহজ গ্রুপ পায় এবং নকআউটে কেপ ভার্দে ও মিশরের মতো অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষ পার করে কোয়ার্টারে সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হচ্ছে। মেসিকে বিশ্বকাপ জেতাতে ফিফা ‘স্ক্রিপ্ট’ বা চিত্রনাট্য লিখছে—এমন অভিযোগ অবশ্য এবারই প্রথম নয়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে পেনাল্টিতে হারার এক বছর পর ২০২৩ সালে নেদারল্যান্ডসের তৎকালীন কোচ লুই ভ্যান গাল ডাচ সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘আর্জেন্টিনা যেভাবে গোলগুলো পেয়েছিল এবং তাদের খেলোয়াড়েরা পার পেয়ে যাচ্ছিল, তা দেখে আমার মনে হয়েছে এটি সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত ছিল। মেসিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বানানোর জন্যই সব করা হয়েছিল।’
ফুটবল ইতিহাসে আর্জেন্টিনার পক্ষে এমন অদৃশ্য শক্তির সহায়তার গল্প নতুন কিছু নয়। ১৯৭৮ সালে নিজেদের মাটিতে প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের সময় দেশটিতে সামরিক একনায়ক হোর্হে রাফায়েল ভিদেলার শাসন চলছিল। ফাইনালে যেতে আর্জেন্টিনার শেষ ম্যাচে পেরুর বিপক্ষে ৪ গোলের ব্যবধানে জিততে হতো। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জেতে ৬-০ গোলে। পরবর্তীতে ২০১২ সালে পেরুর একজন সিনেটর বুয়েনস আইরেসের আদালতে স্বীকার করেন, দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সামরিক শাসক ভিদেলার সাথে পেরু সরকারের রাজনৈতিক চুক্তি হয়েছিল ম্যাচটি ছেড়ে দেওয়ার জন্য। আবার ১৯৯০ বিশ্বকাপে ব্রাজিল বনাম আর্জেন্টিনা ম্যাচে ব্রাজিলের খেলোয়াড় ব্রাঙ্কো অভিযোগ করেছিলেন, আর্জেন্টিনার ফিজিওর দেওয়া পানির বোতল থেকে পানি পানের পর তিনি মাঠে ঝিমিয়ে পড়েছিলেন। ১৫ বছর পর আর্জেন্টিনার তৎকালীন কোচ কার্লোস বিলার্দো এক সাক্ষাৎকারে মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘আমি বলছি না যে এমনটা ঘটেনি।’ মাঠের বাইরের এসব ষড়যন্ত্রতত্ত্ব হয়তো কখনো প্রমাণিত হবে কিংবা হবে না, তবে মাঠের পারফরম্যান্সের যে লিওনেল মেসিরা উজ্জ্বল- সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই। ফুটবল আর রেফারিং বিতর্ক সবসময় পাশাপাশি চলে; এবারের বিশ্বকাপেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না।
-দ্য টেলিগ্রাফ অবলম্বনে









