বিশ্লেষণ
মিসরের গোল কেন বাতিল, আর্জেন্টিনার কেন নয়?

লিওনেল মেসির জাদুর ছোঁয়ায় মিসরের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায় ৩-২ ব্যবধানে জয় পেয়েছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। তবে ম্যাচের ফল ছাপিয়ে আলোচনা চলছে রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে। মিসরের দ্বিতীয় গোলটি ভিএআরের হস্তক্ষেপে বাতিল করা হয়েছিল। আবার প্রায় একই ধরনের ফাউল করলেও আর্জেন্টিনার গোল বাতিল হয়নি। ফুটবল পণ্ডিত ও সাবেক তারকাদের মতে, ভিএআরের সিদ্ধান্তই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।
ম্যাচে যখন ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটনের জন্ম দেওয়ার পথে ছিল মিসর, ঠিক তখনই ঘটে ঘটনাটি। অধিনায়ক মোহামেদ সালাহর নিখুঁত পাস থেকে বল পেয়ে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেসের মাথার ওপর দিয়ে চমৎকার চিপ শটে বল জালে জড়ান মিসরের মোস্তফা জিকো। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার বুনো উল্লাসে মাতে ফারাওরা। কিন্তু ভিএআরের ইশারায় মুহূর্তেই সেই আনন্দ বিষাদে রূপ নেয় এবং গোলটি বাতিল করা হয়।
রিপ্লেতে দেখা যায়, মিসরের
পাল্টা আক্রমণ শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে নিজেদের পেনাল্টি বক্সের ঠিক বাইরে আর্জেন্টিনার
ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেসের পা মাড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং তার জার্সি টেনে ধরেছিলেন
মিসরের মারওয়ান আতিয়া। আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (আইএফএবি) নিয়ম এবং
ফিফার ভিএআর প্রোটোকল অনুযায়ী, প্রতিটি গোলের শুরুর অংশটি পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক।
যেহেতু আতিয়ার ওই চ্যালেঞ্জের সূত্র ধরেই মিসর বলের দখল পেয়েছিল এবং সেই একই ধারাবাহিক
আক্রমণে গোলটি হয়েছিল, তাই প্রযুক্তিগতভাবে রেফারি গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত নিতেই পারেন।
ফুটবলের ১২ নম্বর আইন অনুযায়ী, প্রতিপক্ষের পায়ে পাড়া দেওয়া বা জার্সি টেনে ধরা ‘ফাউল’ হিসেবে গণ্য।
ম্যাচ শেষে ফক্স স্পোর্টসের বিশ্লেষক ও ইংল্যান্ডের সাবেক গোলরক্ষক রব গ্রিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘১০০ গজ দূরে কেউ কারো পায়ের আঙুলে সামান্য পাড়া দিল কি না—তা দেখার জন্য ফুটবলে ভিএআর আনা হয়নি। আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যেখানে এই প্রযুক্তির ক্ষমতার অপব্যবহার করা হচ্ছে। রেফারি মাঠ থেকে চ্যালেঞ্জটি দেখেছিলেন এবং ফাউল না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অথচ এরপর মিসরের একটি চমৎকার কাউন্টার-অ্যাটাক গোল বাতিল করে তাদের দুই গোলের লিড কেড়ে নেওয়া হলো।’
ম্যাচের শেষ দিকে পেনাল্টি এলাকার ভেতরে দুটি আলাদা ঘটনায় ফাউলের আবেদন জানিয়েছিল মিসর। প্রথম ঘটনায় দেখা যায়, আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সের ভেতর আলেক্সিস ম্যাক আলিস্টার মিসরের মিডফিল্ডার হামদি ফাতির জার্সি টেনে ধরেন। এরপর ফাতি মাটিতে পড়ে গেলেও ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া ল্যাটেক্সিয়ারের বাঁশি বাজেনি। এছাড়া যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের গোলের আগে মিসরের প্রাণভোমরা মোহামেদ সালাহ আর্জেন্টিনার ডি-বক্সে ঢোকার সময় হুলিয়ান আলভারেসের চ্যালেঞ্জের মুখে মাটিতে পড়ে যান। সালাহ পেনাল্টি দাবি করলেও রেফারি খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন।
এই দুটি ঘটনাতেই ভিএআর মাঠের রেফারির সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। কিন্তু কেন? এ বিষয়ে সাবেক প্রিমিয়ার লিগ রেফারি ও বর্তমান ক্রীড়া বিশ্লেষক অ্যান্ডি ডেভিস বলেছেন, ‘ম্যাক আলিস্টার হামদি ফাতির জার্সি ধরে কিছুটা ঝুঁকি অবশ্যই নিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি ছিল খুবই অল্প সময়ের জন্য, যা ফুটবলের স্বাভাবিক সংস্পর্শের মধ্যেই পড়ে। এতে ফাতির বল পাওয়ার সম্ভাবনা বা আক্রমণে অংশ নেওয়ার ওপর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রভাব পড়েনি। ফলে এটিকে পেনাল্টি দেওয়ার মতো ফাউল বলা চলে না।’
মোহাম্মদ সালাহর ঘটনা নিয়ে তার বক্তব্য হলো, ‘সালাহ সেখানে ফাউলের শিকার হওয়ার চেয়ে পেনাল্টি আদায়ের চেষ্টা বেশি করেছিলেন। আলভারেসের পক্ষ থেকে কোনো উদ্দেশ্যমূলক ফাউল ছিল না। দুজনের দ্রুত গতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই বুটে বুট লেগেছিল এবং সালাহ অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাটিতে পড়ে যান। মিসরের মারওয়ান আতিয়া স্পষ্ট ও ইচ্ছাকৃতভাবে লিসান্দ্রো মার্টিনেসের পায়ের ওপর পা রেখেছিলেন, যা পরিষ্কার ফাউল। কিন্তু সালাহর ক্ষেত্রে ঘটনাটি ছিল দুই খেলোয়াড়ের গতির কারণে তৈরি হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ও অনিচ্ছাকৃত শারীরিক সংঘর্ষ। ফলে আইনি মারপ্যাঁচে আর্জেন্টিনার গোলটি টিকে যায় এবং মিসর পেনাল্টি পায়নি।’







