বিশ্বকাপের বাকি ৮ দিন
খনি শ্রমিকদের মাধ্যমে ফুটবল পৌঁছে মেক্সিকোতে

মেক্সিকোর প্রথম ফুটবল ক্লাব ‘সিএফ পাচুকা’র সমর্থকরা এই ব্যানারের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান তাদের আদি শিকড়কে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার সঙ্গে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক মেক্সিকো। আর মাত্র ৮ দিন পরই শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের আসর। কিন্তু মেক্সিকোতে কীভাবে ফুটবলের সূচনা হলো— সেটা নিয়ে অনেকেরই কৌতূহল আছে। মেক্সিকোর ইস্তাদিও হিদালগো স্টেডিয়ামে যখন ২৪-২৫ হাজার দর্শক উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন, তখন প্রায়ই একটি বিশেষ ব্যানার নজর কাড়ে। তাতে দেখা যায় এক খনি শ্রমিকের ছবি। এর পেছনের রহস্যটা কী?
মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন খনি শ্রমিকরা। মেক্সিকোর অন্যতম প্রাচীন ও প্রথম ফুটবল ক্লাব হিসেবে স্বীকৃত ‘সিএফ পাচুকা’র সমর্থকরা মূলত এই ব্যানারের মাধ্যমে শ্রদ্ধা জানান তাদের আদি শিকড়কে। ব্যানারে সেই শ্রমিকের এক হাতে দেখা যায় খনি খননের কুড়াল আর অন্য হাতে বিশেষ এক ধরনের পেস্ট্রি বা পিঠা। পেছনে উড়ছে কালো রঙের মাঝে সাদা ক্রস চিহ্নের দুটি পতাকা।
যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ মাত্রই চিনে নেবেন এটি কর্নওয়ালের ঐতিহ্যবাহী পতাকা। যুক্তরাজ্যের কর্নওয়াল থেকে আসা খনি শ্রমিকদের হাত ধরেই মেক্সিকোয় ফুটবল খেলার সূচনা হয়েছিল। কর্নওয়াল ও মেক্সিকোর হিদালগোর মধ্যকার এই আটলান্টিক-পারাপারের সম্পর্কটি গড়ে ওঠে ১৮২৪ সালে। স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর এক দশকের যুদ্ধ শেষে মেক্সিকোর খনিশিল্প তখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। সেই সময় জন টেলর নামের এক ব্রিটিশ খনি প্রকৌশলী কর্নওয়ালের শ্রমিকদের নিয়ে মেক্সিকোর রিয়াল দেল মন্তে নামের খনি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। এর ফলে পরবর্তী কয়েক দশকে শত শত শ্রমিক কাজের সূত্রে মেক্সিকোয় যাতায়াত শুরু করেন। আর এই অভিবাসনের হাত ধরেই মেক্সিকোয় আগমন ঘটে ব্রিটিশ সংস্কৃতি এবং ফুটবলের, যদিও খনি শ্রমিকরা শুরুতে ফুটবল খেলত না, তারা খেলত ক্রিকেট।
১৮৫০-এর দশকের শেষের দিকে
ফ্রাঙ্ক রুল নামের এক কর্নিশ খনি ব্যবসায়ী পাচুকাতে একটি ক্রিকেট দল গঠন করেন। কর্নিশ
খনি পরিযাজন বিশেষজ্ঞ ড. শ্যারন শোয়ার্টজ বলেন, ‘মূলত ক্রিকেট
ক্লাব থেকেই ফুটবল ক্লাবের জন্ম। অনেক সময় একই খেলোয়াড়রা দুই খেলাই খেলতেন।’ ১৮৯৫ সালে পাচুকা ক্রিকেট ক্লাব ও ফুটবল ক্লাব মিলে গঠিত হয় ‘পাচুকা অ্যাথলেটিক ক্লাব’। ফ্রাঙ্ক রুল ক্লাবের জন্য তার নিজস্ব জমি দান করেন।
তবে শর্ত ছিল তার মেথডিস্ট ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে রবিবারে কোনো খেলা হবে না।
১৯০২ সালের মধ্যে মেক্সিকোর প্রথম ফুটবল লিগ ‘লিগা মেক্সিকানা দে ফুটবল অ্যামেচার অ্যাসোসিয়েশন’ গঠিত হয়, যেখানে পাচুকা ১৯০৪-০৫ মৌসুমে শিরোপাও জেতে। এই যাতায়াতের ফলে দুই দেশের মধ্যে এক অদ্ভুত মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম হয়। কর্নওয়ালের খনি শ্রমিকদের প্রিয় খাবার ছিল ‘পেস্টি’ (এক ধরনের মাংস ও সবজি ভরা পিঠা)। খনির নোংরা হাতে ধরার সুবিধার্থে এর একপাশ ছিল বেশ শক্ত ও মোটা।মেক্সিকোয় খেলা দেখার সময় কর্নিশ নারীরা এই পেস্টি বানিয়ে আনতেন। আজ শত বছর পরেও মেক্সিকোর পাচুকা ও রিয়াল দেল মন্তেতে এই খাবারটি ‘পাস্তেস’ নামে অত্যন্ত জনপ্রিয়, তবে মেক্সিকানরা এখন এতে নিজস্ব ঐতিহ্য অনুযায়ী মরিচ বা চিলি যোগ করে নিয়েছে। ২০০৯ সাল থেকে সেখানে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক পাস্তেস উৎসবও হয়।
১৯০৮ সালে আলফ ক্রোল নামের এক কর্নিশ খনি শ্রমিকের ছেলের হাত ধরে পাচুকা ক্লাবে প্রথম মেক্সিকান ফুটবলার ডেভিড ইসলাস সুযোগ পান। ক্রোল পরবর্তী সময়ে দলটির খেলোয়াড়-কোচ হন এবং জাতিগত ও সামাজিক ভেদাভেদ দূর করতে বড় ভূমিকা রাখেন। ১৯২০-এর দশকে মেক্সিকান বিপ্লবের পর অনেক ব্রিটিশ দেশ ছাড়লে মূল ক্লাবটি বন্ধ হয়ে যায়, তবে ১৯৫০ ও ১৯৬০ সালে এটি পুনরায় গঠিত হয়। পরে এই পাচুকা ক্লাবটি মেক্সিকান লিগের ৭টি শিরোপাসহ ২০০৬ সালে কোপা সুদামেরিকানা জয়ের গৌরব অর্জন করে।
খনি খননকারী এক ধরনের ইঁদুরের নামানুসারে ক্লাবটির ডাকনাম এখন ‘লোস তুজোস’। পাচুকার সমর্থক এদুয়ার্দো হার্নান্দেজ বলেন, ‘এটি আমাদের পরিচয়ের অংশ। আমরা গর্বিত যে খনি শ্রমিকরা আমাদের দেশে ফুটবল নিয়ে এসেছিলেন।’ চলতি বিশ্বকাপে মেক্সিকানরা যখন গ্যালারিতে রঙ ছড়াতে প্রস্তুত, তখন কর্নওয়াল ও হিদালগোর মানুষ টিভির সামনে বসবেন হাতে সেই ঐতিহ্যবাহী ‘পেস্টি’ কামড় দিয়ে।









