রাখাইনে বিমান মানেই মৃত্যু
বোমা বৃষ্টির মাঝেই বেড়ে উঠছে শিশুরা

সংগৃহীত ছবি
একসময় রাখাইনের শিশুরা বিমান দেখলে ভ্রমণ, বাণিজ্য কিংবা নতুন কিছু দেখার কৌতূহলের কথা ভাবত। কিন্তু আজ তাদের কাছে বিমান মানেই ভয়, মৃত্যু আর ধ্বংসের প্রতীক। শিশুদের চিত্রাঙ্কন খাতায় এখন আর পাহাড়, আকাশ, নদী বা খেলার মাঠের ছবি দেখা যায় না। তারা আঁকে যুদ্ধবিমান। কেউ বিমানের মুখে ধারালো দাঁত এঁকে দেয়। কেউ আবার সেটিকে হাঙরের রূপ দেয়। কেন এমন অদ্ভুত ছবি আঁকে তারা? জানতে চাইলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের পোনাগ্যুন টাউনশিপে বাস করা এক শিশুর সহজ উত্তর, ‘কারণ বিমান মানুষ খায়।’
এটি কোনো রূপক জবাব নয়; বরং অব্যাহত বিমান হামলার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের মানসিক অবস্থার বাস্তব প্রতিফলন। রাখাইনে কাজ করা স্থানীয় সিভিল সোস্যাইটি গ্রুপগুলোর মতে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিমান হামলা বাড়তে থাকায় শিশুদের মধ্যে গভীর ও ক্রমবর্ধমান মানসিক ট্রমা তৈরি হচ্ছে। স্কুল কিংবা বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয় শিবির— সবখানেই বিমানের শব্দ শুনলেই শিশুরা বোমা থেকে রক্ষার জন্য মাটির গর্তে লাফিয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পাঠদান বন্ধ করে শিশুদের নিরাপত্তা মহড়ায় অংশ নিতে হয়।
বর্তমানে পোনাগ্যুনের একটি অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি (আইডিপি) শিবিরে বসবাসকারী ১২ বছরের মা থুজার হ্লাইং বলেন, ‘একসময় আমরা আকাশে উড়ন্ত বিমান দেখে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাতাম। এখন আমরা সেগুলোর দিকে তাকাতেও ভয় পাই। বিমানের শব্দ শুনলেই বোমার গর্তে আশ্রয় নিই।’
২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে রাখাইনের পরিস্থিতিতে এসেছে বড় পরিবর্তন। বর্তমানে রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকার ওপর কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে ইউনাইটেড লীগ অফ আরাকান এবং আরাকান আর্মি। স্থলভাগে নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে ব্যর্থ হয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ক্রমশ বিমান হামলা ও দূরপাল্লার গোলাবর্ষণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
আরাকান আর্মির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বিমান হামলা, গোলাবর্ষণ ও স্থল অভিযান মিলিয়ে রাখাইনে অন্তত ১,১৫২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ২,১৫৩ জন আহত হয়েছেন। ২০২৬ সালেও হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে।
তবে এসব পরিসংখ্যান শিশুদের বাস্তব দুর্ভোগ পুরোপুরি তুলে ধরতে পারে না। যুদ্ধের কারণে বহু স্কুল ধ্বংস হয়েছে। হাসপাতাল পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। মঠ, আবাসিক এলাকা এমনকি বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয়শিবিরও হামলার শিকার হয়েছে।
২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে, ম্রাউক-ইউ সরকারি হাসপাতালে চালানো বিমান হামলায় ৩০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত এবং ৭০ জনের বেশি আহত হন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি হাসপাতালের ওপর হামলা ছিল না; বরং মানুষের নিরাপদ আশ্রয়ের ওপরও আঘাত।
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কিয়াউকতাউ টাউনশিপের একটি বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে বিমান হামলায় ২০ জন শিক্ষার্থী নিহত এবং আরও ২১ জন আহত হয়। ওই হামলার ধাক্কা পুরো রাখাইনের নাজুক শিক্ষা ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই যুদ্ধে শিশুরা কেবল ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার’ নয়; বরং তারা যুদ্ধের মধ্যেই বেড়ে উঠছে। তাদের শৈশব এখন ভয়, অনিশ্চয়তা এবং আকাশ থেকে নেমে আসা মৃত্যুর আতঙ্কে আচ্ছন্ন।
রাখাইনের শিশুদের মানসিক সংকট মোকাবিলায় কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে ছবি আঁকার কর্মশালা, ভ্রাম্যমাণ গ্রন্থাগার এবং অনানুষ্ঠানিক কাউন্সেলিং কার্যক্রম। তবে বাস্তবতা হলো, শিশুদের মনে যেমন মানসিক আঘাত ও ট্রমা তৈরি হয়েছে, তার তুলনায় এসব সহায়তা খুবই সীমিত।
শিক্ষকদের মতে, অনেক শিক্ষার্থী এখন পাঠে মনোযোগ দিতে পারে না। সামান্য উচ্চ শব্দেও তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ স্কুলে ফিরতে অনীহা প্রকাশ করছে। আবার অনেক অভিভাবক সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদের স্কুলে পাঠাতেও দ্বিধা করছেন। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম এখন অনেকের কাছে শেখার চেয়ে ঝুঁকি মূল্যায়নের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফ বারবার সতর্ক করে বলেছে, মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের হত্যা ও পঙ্গুত্বের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে জনবহুল এলাকায় বিস্ফোরক অস্ত্র ব্যবহারের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুরা।
ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে শিশু হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এসব ঘটনার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে বিমান হামলা অন্যতম। সংস্থাটি স্কুল ও হাসপাতালকে বেসামরিক অবকাঠামো হিসেবে সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানিয়ে এসেছে। তাদের মতে, এসব স্থাপনা কোনো অবস্থাতেই হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া উচিত নয়। কিন্তু রাখাইনের বাস্তবতায় সেই সীমারেখা কার্যত বিলীন হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বারবার বিমান হামলার অভিজ্ঞতা শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি মানসিক
সমস্যার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের ব্যাঘাত
এবং স্বাভাবিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে। যেসব শিশু বাস্তুচ্যুত হয়েছে বা
পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই মানসিক ক্ষত আরও গভীর হচ্ছে। তাদের
মতে, রাখাইন এখন শুধু মানবিক সংকটের মুখোমুখি নয়; বরং একটি পুরো প্রজন্ম দীর্ঘমেয়াদি
সংকটে পড়েছে।
অনুবাদ: সালমান রিয়াজ




