ইসলামী ব্যাংক যেখান থেকে এখানে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্বাধীনতার পর দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে ইসলামি ব্যাংকিং ধারণা প্রতিষ্ঠা করাই ছিল এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। সেই অবস্থায় দেশি-বিদেশি উদ্যোক্তাদের অভিনব কৌশল এবং নিরলস চেষ্টায় ১৯৮৩ সালে যাত্রা করে ইসলামী ব্যাংক। এরপর হাঁটি হাঁটি পায়ে ৪৪ বছরে পা রেখেছে ব্যাংকটি। দীর্ঘ এ যাত্রায় নানা বাধার মুখে পড়লেও থেমে যায়নি। নানা সময়ে নানা প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতা জয় করে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে সুনাম কুড়িয়েছে বিদেশেও। মাঝপথে কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা চলে গেছেন। এরপর ২০১৭ সাল থেকেই বাংলাদেশের আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করছিল। তবে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়। সেই সময়ের পরে একাধিক দফায় বদলেছেন চেয়ারম্যান। সবশেষে নতুন চেয়ারম্যান নিয়েই মূলত নতুন অস্থিরতা শুরু।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর ব্যাংকটিতে আবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সমর্থকরা। নিজেদের মতো করে পর্ষদ সাজিয়েছিলেন তারা। অর্থনীতিবিদদের অনেকে মনে করেন, ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকটিকে এবার নিজেদের মতো সাজাতে চাইছে বিএনপি সরকার। মূলত এ কারণেই ব্যাংকটির দায়িত্বশীল পদগুলোতে আবারও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
গত মাসের ২৪ তারিখে ব্যাংকটির নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে তার নিয়োগ বাতিলের দাবিতে ‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে আন্দোলনে নেমেছে একটি পক্ষ। এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে বলেই মনে করেন ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ইসলামী ব্যাংক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার লড়াই এখনো চলছে।
যদিও ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলনরতরা বলছেন, নতুন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ব্যাংকটি আবারও একটি বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে, এই শঙ্কা থেকেই আন্দোলনে নেমেছেন তারা।
২০১৭ সাল থেকেই বাংলাদেশের আলোচিত শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করছিল। তবে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাংকটিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে অন্তর্বর্তী সরকার
বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ ১ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা। আমানতকারীদের হিসাব সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ। ইসলামী ব্যাংকের আমানতের সিংহভাগই ব্যক্তিশ্রেণির। দেশের সব অঞ্চলের শ্রেণি-পেশার মানুষ গ্রাহক। দেশের প্রায় ৮ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে জড়িত। সারা দেশে বিস্তৃত রয়েছে প্রায় ৪০০ শাখা। এসব শাখার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে ২৭১টি উপশাখা ও ২ হাজার ৭৮৮টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট। রাজধানী ও শহরের পাশাপাশি দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ গ্রামে ইসলামী ব্যাংকের উপস্থিতি পাওয়া যায়।
ইসলামী ব্যাংকের মোট শেয়ার ১৬১ কোটি। এর মধ্যে এস আলম গ্রুপ এখন নিয়ন্ত্রণ করছে ১৩১ কোটি ৩৫ লাখ ৯৯ হাজার শেয়ার, যা মোট শেয়ারের ৮১.৫৯ শতাংশ। রাজনৈতিক পোলিং পরিষেবা বাজারে ইসলামী ব্যাংকের প্রতিটি শেয়ারের দাম ৪২ টাকা হিসাবে এস আলমের শেয়ারগুলোর বাজারমূল্য দাঁড়ায় ৫ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকা। এস আলমের এই বিপুল মালিকানা অর্জনের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ আছে, গ্রুপটি ব্যাংক থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাচার করেছে।
২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর সাবেক ব্যাংকার ওবায়দুল্লাহ আল মাসুদকে চেয়ারম্যান করা হয়। তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন গ্রাহকরা। কিন্তু সরকার তা আমলে না নিয়ে তাকে বহাল রাখে। যদিও তিনি বর্তমানে দুর্নীতি মামলায় কারাগারে রয়েছেন। তার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবায়দুর রহমানকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। এর মধ্যে গত ২৪ মে তাকে বাধ্যতামূলক পদত্যাগ করায় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই দিনে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলম। তবে তার নিয়োগ নিয়েই চলছে আন্দোলন।
চলমান আন্দোলন নিয়ে অনেকেই যেমন প্রশ্ন তুলেছেন, তেমনি ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি নিয়েও হচ্ছে সমালোচনা। অর্থনীতিবিদ এবং ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা পরিবর্তনের সঙ্গে যেন দখল-পাল্টা দখলের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক ড. আহসান হাবীব বলেছেন, ইসলামী ব্যাংক ব্যাংকিং সিস্টেমের পিলার। ব্যাংকটি কর্মসংস্থান, ব্যবসা, বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্সে অনন্য ভূমিকা রাখছে।
ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হুসাইনের ভাষ্য, বর্তমান সংকট শুধু একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়। এটি পুরো ব্যাংক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমরা সুশাসন ও আস্থার মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংককে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিতে সব চেষ্টা করছি। একটা সময় সংকট কেটে যাবে বলে আশা করা যায়।




