‘গরিবের ডাক্তার’ এবাদুল্লাহ

সাতক্ষীরা শহরে নিজ চেম্বারে রোগী দেখছেন ডা. এবাদুল্লাহ
সকাল ৮টা, তখনো ভিড় জমে ওঠেনি। সাতক্ষীরা শহরের পাকাপোল মোড়ের নওয়াব মেমোরিয়াল ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারের সামনে জড়ো হচ্ছেন রোগীরা। কেউ ভ্যানচালক, কেউ দিনমজুর, কেউবা গৃহকর্মী। চোখে ভরসা নিয়ে তারা দাঁড়িয়ে রয়েছেন ডাক্তারের অপেক্ষায়। ৯টার পর থেকে ১০ টাকার একটি নোট বাড়িয়ে দিলেই মিলছে একজন অভিজ্ঞ এমবিবিএস চিকিৎসকের পরামর্শ। বর্তমান সময়ে যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ফি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে চার দশকের বেশি সময় ধরে প্রথমে মাত্র ৫ টাকা, পরে ১০ টাকায় চিকিৎসাসেবা দিয়ে নজির স্থাপন করেছেন সাতক্ষীরার সাবেক সিভিল সার্জন ও প্রবীণ চিকিৎসক মো. এবাদুল্লাহ। স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘গরিবের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত।
আদর্শের নেপথ্যে পারিবারের অনুপ্রেরণা: সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামের ডা. এবাদুল্লাহ ১১ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড়। শৈশব থেকেই অত্যন্ত মেধাবী এবাদুল্লাহর পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তার দাদা নওয়াব আলী। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, নওয়াব আলীর স্বপ্ন ছিল, নাতি একদিন বড় চিকিৎসক হয়ে নিজেকে বিলিয়ে দেবেন আর্তমানবতার সেবায়। সে স্বপ্নকেই নিজের জীবনের মূল দর্শনে পরিণত করেছেন ডা. এবাদুল্লাহ।
মুক্তিযুদ্ধে চিকিৎসকের ভূমিকা: ডা. এবাদুল্লাহ আগামীর সময়কে জানালেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পড়া অবস্থায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে সাতক্ষীরায় ফিরে যুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আহত মুক্তিযোদ্ধা, নির্যাতিত নারী ও সাধারণ মানুষকে গোপনে চিকিৎসাসেবা দেন। স্বাধীনতার পর তিনি পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন এবং ২০১০ সালে সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন হিসেবে অবসরে যান।
৫ থেকে ১০ টাকার দীর্ঘ পথচলা: ১৯৮০ সালের দিকে ডা. এবাদুল্লাহ যখন নিজ চেম্বারে রোগী দেখা শুরু করেন, তখন ফি ঠিক করেছিলেন মাত্র ৫ টাকা। তিনি জানালেন, মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের চিকিৎসাবঞ্চিত হওয়ার বাস্তবতা খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন বলেই তার এ সিদ্ধান্ত। ক্লিনিক ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল ও কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির কারণে ২০১৫ সাল থেকে তিনি ফি ১০ টাকা করতে বাধ্য হন।
‘আমি যখন ৫ টাকায় রোগী দেখা শুরু করি, তখন অনেকেই হাসাহাসি করেছেন। আমাকে ৫ টাকার ডাক্তার বলে কটাক্ষও করেছেন। কিন্তু আমি চেয়েছি, সাধারণ মানুষ যেন অন্তত ফি দেওয়ার ভয়ে চিকিৎসাবঞ্চিত না হন’— স্মৃতিচারণ করছিলেন ডা. এবাদুল্লাহ।
রোগীরা খুশি: স্থানীয় রোগী ছাড়াও ক্লিনিকটিতে প্রতিদিন যশোর-খুলনা থেকে রোগী আসেন। ইজিবাইকচালক মাসুদ রানা সন্তুষ্টি জানিয়ে বললেন, ‘১০ টাকায় দেখাতে পারি বলেই আমরা ডাক্তারের কাছে আসার সাহস পাই। তিনি আমাদের মতো গরিবের ভরসার স্থল। খুব প্রয়োজন না হলে পরীক্ষার কথা বলেন না। ওষুধ লেখেন কম। এতে আমাদের সাশ্রয় হয়।’
‘বড় ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্য আমার নেই। ১০ টাকা ফি দিয়ে যে টাকা বাঁচে, তা দিয়ে ওষুধ কিনতে পারি। অনেক সময় ওষুধ কেনার টাকা না থাকলে ডাক্তার সাহেব কোম্পানি থেকে পাওয়া স্যাম্পল ওষুধও দিয়ে দেন’— বলছিলেন গৃহকর্মী হামিদা বেগম।
ডা. এবাদুল্লাহর সহকর্মীরা জানালেন, প্রতিদিন গড়ে ৮০-৯০ জন রোগী এখানে সেবা নিতে আসেন।
তরুণ চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান: আগামীর সময়ের সঙ্গে আলাপকালে অনেক তরুণ চিকিৎসকের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট নিয়েও কথা বলেন ডা. এবাদুল্লাহ। তার মতে, রোগীর সঙ্গে আন্তরিক ব্যবহার অর্ধেক চিকিৎসার কাজ করে দেয়। তরুণ প্রজন্মের চিকিৎসকদের প্রতি তার আহ্বান, চিকিৎসাকে শুধু পেশা হিসেবে না নিয়ে মানবিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
ডা. এবাদুল্লাহ মনে করেন, ‘টাকা-পয়সা বা খ্যাতির চেয়ে মানুষের দোয়া অনেক বড়। রাস্তায় হাঁটলে মানুষ যখন সালাম দেয় বা দোয়া করে, সেটিই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।’ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মানুষের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জানালেন, মানবসেবার মধ্যেই প্রকৃত সুখ খুঁজে পান তিনি।




