বন্ধ কারখানা বাড়ছে দাম ঝুঁকিতে বিনিয়োগ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
২৪ বছর ধরে উৎপাদনহীন ও সম্পূর্ণ বন্ধ একটি কারখানা। বছরের পর বছর ধরে শুধু লোকসানই গুনছে প্রতিষ্ঠানটি। ভবিষ্যতে ফের উৎপাদনে ফেরার কোনো সম্ভাবনা বা তথ্যও নেই। তা সত্ত্বেও শেয়ারবাজারে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের শেয়ারের দামে ঘটছে রহস্যজনক উল্লম্ফন। রহস্যের জাল ভেদ করে দাম বাড়ার কারণ উদ্ঘাটনে তদন্তে নেমেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। বিষয়টি বিশেষ নজরদারিতে রেখেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
শেয়ারের দাম বাড়ার চিত্রটি রীতিমতো বিস্ময়কর। চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল মাত্র ১৭ দশমিক ৫০ টাকা। সাড়ে চার মাসের ব্যবধানে গত ৩ জুন তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯১ দশমিক ১০ টাকায়। অর্থাৎ, এই সময়ের মধ্যে শেয়ারটির দাম বেড়েছে ৪২০ দশমিক ৫৭ শতাংশ। আর শুধু গত এক মাসেই শেয়ারটির দাম বেড়েছে ১১৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। এমন অস্বাভাবিক উত্থানের পেছনে প্রভাবশালী কোনো কারসাজি চক্র জড়িত থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বিএসইসির পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালাম আগামীর সময়কে বলেছেন, গত ৬ মে থেকে মেঘনা পেট ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারের দাম অস্বাভাবিক বাড়ার কারণ খুঁজতে তদন্ত শুরু হয়েছে। ডিএসইকে মৌখিকভাবে দ্রুত তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে সার্কুলার বা সিরিয়াল ট্রেডিং করে কারসাজি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ডিএসইর সুপারিশ এবং বিএসইসির নজরদারির তথ্যের ভিত্তিতে কারসাজির নেপথ্যে জড়িতদের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চেয়ে গত ১৮ মে ডিএসই কোম্পানিটিকে একটি ব্যাখ্যামূলক চিঠি পাঠায়। এর জবাবে মেঘনা পেট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের কাছে এমন কোনো অপ্রকাশিত বা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই, যার কারণে শেয়ারের দাম বাড়তে পারে। অর্থাৎ, কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রমে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন আসেনি। এ ছাড়া কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, কোম্পানির নিট লোকসান হয়েছে ৩ দশমিক ৩ কোটি টাকা। এতে শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ২.৭৫ টাকায় এবং ঋণাত্মক নিট অপারেটিং ক্যাশফ্লো দাঁড়িয়েছে শূন্য দশমিক ০২ টাকায়। এমন ভয়াবহ প্রতিকূল অবস্থায় কোম্পানিটির ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা নিয়ে তীব্র সংশয় ও অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেছে নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠান মো. আব্দুল বারি অ্যান্ড কোং চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন আগামীর সময়কে বলেছেন, ২০০২ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে মেঘনা পেট। কোম্পানিটির নিজস্ব ঘোষণা অনুযায়ী ফের চালু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। ২৪ বছর ধরে বন্ধ থাকা সত্ত্বেও সম্প্রতি রহস্যজনকভাবে কোম্পানিটির শেয়ারের দাম বাড়ছে। কোম্পানিটির এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পক্ষে জেনে-বুঝে শেয়ার কেনা সম্ভব নয়। পর্দার আড়ালে বাজারের প্রভাবশালী কোনো কারসাজি চক্র এর পেছনে জড়িত থাকতে পারে। বিষয়টি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার গুরুত্ব দিয়ে বিষদভাবে খতিয়ে দেখা উচিত।
২০০১ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া ‘জেড’ ক্যাটাগরির এই কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১২ কোটি টাকা এবং মোট শেয়ার সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ। সর্বশেষ ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ৪৩ দশমিক ৫৫ শতাংশ শেয়ার উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের হাতে, ৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে এবং ৫০ দশমিক ১০ শতাংশ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।




