আগামীর সময়কে জাফর পানাহি
ইরানে বসবাস করলে সবসময়ই আশঙ্কা কাজ করে

নিষিদ্ধতার প্রাচীর ভেঙে ক্যামেরাকে বানিয়েছেন মুক্তির ভাষা। ইরানের রাস্তাঘাট, নিঃশব্দ ঘর আর মানুষের ভেতরকার অদৃশ্য শৃঙ্খল— সবই তার ফ্রেমে উঠে এসেছে এক অনিবার্য কবিতার মতো। রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞা তাকে দমাতে পারেনি; বরং প্রতিটি চলচ্চিত্র হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের নীরব মিছিল। সীমাবদ্ধতার ভেতরেও তিনি খুঁজে নেন স্বাধীন জানালা। এসব চলচ্চিত্র তাই শুধুই গল্প নয়; যেন হয়ে উঠেছে এক অদম্য মানুষের জীবন্ত দিনলিপি, যেখানে শিল্প মানেই সাহস। আর সাহস মানেই বেঁচে থাকা। তিনি ইরানের জাফর পানাহি। ৬৫ বছর বয়সী খ্যাতিমান এ নির্মাতার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জনি হক। ফারসি ভাষায় উত্তর দিয়েছেন তিনি। তার কথা ইংরেজিতে অনুবাদ করে দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন ভাষান্তরিক শেইদা দায়ানি।
আপনার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়ে ভালো লাগছে। বাংলাদেশের আপনার চলচ্চিত্র দর্শক নিয়মিত দেখে। আরেকটা কথা জানিয়ে রাখি— বাংলাদেশের অনেক চলচ্চিত্র নির্মাতা আপনার কাজে প্রভাবিত।
এগুলো ভালো লাগার মতো ঘটনা। ধন্যবাদ।
‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’ ফ্রান্স থেকে অস্কারে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য মনোনীত হয়েছিল। যদি ইরানের পক্ষ থেকে সিনেমাটি জমা দেওয়া হতো, তাহলে নিশ্চয়ই আরও বেশি খুশি হতেন?
অস্কারে অ-ইংরেজি কোনো চলচ্চিত্র জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি নিয়ম ছিল যে, সেটি নিজ দেশের অন্তত একটি প্রেক্ষাগৃহে কমপক্ষে এক সপ্তাহ প্রদর্শন করতে হবে। মনে পড়ে, এই নিয়ম আমার ‘দ্য সার্কেল’ সিনেমার ক্ষেত্রে একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পরে ‘অফসাইড’-এর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। পরিবেশনা সংস্থা সনি পিকচার্স ক্ল্যাসিকস তখন ইরান সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে একটি চিঠি লিখে ‘অফসাইড’ অন্তত এক সপ্তাহের জন্য ইরানে প্রদর্শনের জন্য অনুরোধ করেছিল, যাতে এটি অস্কারে পাঠানো যায়। তাদের বিশ্বাস ছিল, এর ফলে ইতিবাচক কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু ইরানি কর্তৃপক্ষ এক সপ্তাহের জন্যও ‘অফসাইড’ প্রদর্শনের অনুমতি দিতে রাজি হয়নি। এ কারণে সিনেমাটি অস্কারে পাঠানো যায়নি।
অস্কারে অ-ইংরেজি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে প্রতিযোগিতা করার একমাত্র উপায় ছিল, কোনো দেশের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন পাওয়া। অথচ ইরান কখনোই আপনাকে নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ দেয়নি...
দীর্ঘদিন ধরে অস্কারের এসব নিয়মের বিরোধিতা করে এসেছি। সবসময়ই বলেছি, ইরানের মতো স্বৈরাচারী ও শাসকগোষ্ঠীগুলোর কারণে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হয়, সেসব বাস্তবতা ও সমস্যা যথাযথভাবে বিবেচনা করেনি অস্কার। আমার সবসময়ই ইচ্ছা ছিল, আমার চলচ্চিত্র শুধু দেশের পক্ষ থেকে অস্কারে পাঠানোই নয়, বরং আমার নিজের দেশেই যেন প্রদর্শিত হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে কখনোই তেমন পরিস্থিতি ছিল না।
ইউরোপের শীর্ষ তিন চলচ্চিত্র উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার জয় করা একমাত্র নির্মাতা জাফর পানাহি। ২০২৫ সালে ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’ কান উৎসবের স্বর্ণপাম, ২০১৫ সালে ‘ট্যাক্সি’ বার্লিনের স্বর্ণভালুক (গোল্ডেন বিয়ার) ও ২০০০ সালে ‘দ্য সার্কেল’ ভেনিসে স্বর্ণসিংহ (গোল্ডেন লায়ন) জিতেছে।
‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’ চলচ্চিত্রে একটি জোরালো রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। অস্কার কর্তৃপক্ষ (একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্সেস) যদি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নিজ নিজ দেশের সরকারের সঙ্গে যুক্ত করা এড়ানোর কোনো উপায় খুঁজে বের করতে চায়, তাহলে সেই সমাধান কী হতে পারে বলে মনে করেন? এ ধরনের একটি ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর হতে পারে?
অস্কারের নিয়মকানুন কখনো কখনো ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে সময়ের সঙ্গে সেগুলো পরিবর্তন করা প্রয়োজন। এটি শুধু ইরানের সমস্যা নয়। বিশ্বের আরও অনেক দেশের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে। যেমন রাশিয়া, চীন, এমনকি কখনো কখনো ভারতেও একই ধরনের সংকট দেখা দেয়। আরও অনেক দেশেরই একই সমস্যা রয়েছে। অস্কারকে একটি বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে হবে, অথবা তারা হয়তো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র বিভাগটিই ভেঙে দিতে পারে। কারণ, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রগুলোকে সব বিভাগে বিবেচনা করা এবং প্রতিযোগিতা করার সুযোগ দেওয়া উচিত। সম্ভবত এটাই ভালো একটি সমাধান হতে পারে। এখন আমাদের অপেক্ষা করে দেখতে হবে আগামীতে কী ঘটে। অবশ্য গত বছর অস্কার কর্তৃপক্ষ যেকোনো চলচ্চিত্রকে নিজ দেশে প্রদর্শনের বাধ্যতামূলক নিয়ম তুলে দিয়েছে। কিন্তু এখনো আমাদের সামনে এ সমস্যা রয়ে গেছে, যেকোনো চলচ্চিত্র অস্কারে পাঠানোর জন্য এখনো সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার বা সরকারি মনোনয়ন কমিটির নির্বাচনের ওপর নির্ভরশীল। আমরা খুব সহজেই আমাদের সিনেমা বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসব ও অন্যান্য পুরস্কার আয়োজনে পাঠাতে পারি। সেক্ষেত্রে সাধারণত কোনো বাধার মুখে পড়তে হয় না। কিন্তু একমাত্র যে বিষয়টি আমাদের মতো চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নিজ নিজ সরকারের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে, তা হলো অস্কারের এ নিয়মকানুন।
ইরানের মতো একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করলে সবসময়ই এক ধরনের আশঙ্কা কাজ করে। সেদিন গভীর রাতে আমার এক বন্ধু ফোন করে জানাল, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আমার বাসায় অভিযান চালিয়েছে
(চলচ্চিত্র নির্মাণের কারণে নিজের দেশ ইরানে কয়েকবার কারাবন্দি হয়েছেন জাফর পানাহি। ২০০৯ সালে প্রথবার গ্রেপ্তার হন তিনি। ২০১০ সালে ইরানের একটি আদালতে দেশটির ‘নিয়ম-নীতির বিরুদ্ধে অপপ্রচারে’র অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ২০ বছরের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ ও বিদেশ ভ্রমণে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। ইরান সরকারের সমালোচনাকারী দুই চলচ্চিত্র নির্মাতাকে বন্দি রাখার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানোর কারণে কারাবাস করতে হয়েছে তাকে। ২০২৩ সালে তিনি মুক্তি পান। ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগে গত বছর ডিসেম্বরে তার এক বছরের কারাদণ্ড ও দুই বছরের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তেহরানের ইসলামি বিপ্লবী আদালত)
সম্প্রতি ইরান সরকার আপনাকে এক বছরের কারাদণ্ড এবং দুই বছরের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এ রায়ের খবর শুনে আপনার প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
সত্যি বলতে, আগেও এমন অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছি। তাই বিশেষ কোনো ধাক্কা খাইনি। বরং হয়তো এমন কিছু ঘটতে পারে বলেই ধারণা করছিলাম। ইরানের মতো একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে বসবাস করলে সবসময়ই এক ধরনের আশঙ্কা কাজ করে। সেদিন গভীর রাতে আমার এক বন্ধু ফোন করে জানাল, ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা আমার বাসায় অভিযান চালিয়েছিল। তারা আমাকে হাজতে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। এই যে রাত-বিরাতে জেগে ওঠার অনুভূতি বা সবচেয়ে খারাপ কিছু ঘটার আশঙ্কা, এটা শুধু কারও একার নয়, বরং বন্ধুসহ দেশের যে কারও ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, হোক ব্যাপকভাবে পরিচিতি কিংবা একেবারেই অপরিচিত। এখন এ নিয়ে বেশি চিন্তা করতে চাই না। শুধু আমার যাত্রা চালিয়ে যেতে চাই।
আপনি এর আগে ইরানে দুবার কারাবন্দি হয়েছেন...
হ্যাঁ।
(প্রতিশোধমূলক কমেডি থ্রিলার ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’। বাহিদ নামের এক ব্যক্তি নকল পা-ওয়ালা এক ব্যক্তিকে অপহরণ করে, যিনি দেখতে ঠিক সেই ব্যক্তির মতো যে বাহিদকে কারাগারে নির্যাতন করত। সেসব দিন তার জীবনের সর্বনাশ ডেকে এনেছিল। বাহিদ অন্য কারাবন্দিদের সঙ্গে যাচাই করতে বেরিয়ে পড়ে যে, লোকটি সত্যিই তাদের নির্যাতনকারী কি না। তারপর তার সঙ্গে কী করা উচিত সেই সিদ্ধান্ত)
যতদূর জানি, ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাকসিডেন্ট’ চলচ্চিত্রটি গোপনে নির্মাণ করেছেন। বইয়ের দোকান, ফার্মেসি ও ব্যস্ত সড়কের দৃশ্যগুলো কীভাবে ধারণ করেছিলেন? কখনো এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন যেখানে প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিলেন?
ফার্মেসি ও বইয়ের দোকানে দৃশ্যধারণ করা আমাদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ছিল। কারণ, সেগুলো ছিল বদ্ধ স্থান। ফলে ভেতরে কী হচ্ছে বাইরে থেকে দেখা যেত না। তবে একপর্যায়ে সরকারি কর্তৃপক্ষ শুটিংয়ের তথ্য ও ধারণকৃত উপকরণ জব্দ করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমরা সেগুলো তাদের হাতে দিইনি। তাদের ধারণা ছিল, শুটিং সবেমাত্র শুরু হয়েছে! তাই তারা আমাদের টিমের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকে হুমকি দিয়েছিল যে, তারা আমার সঙ্গে আর কাজ করতে পারবে না। সেই কারণে প্রায় এক মাসের জন্য পুরো প্রকল্প স্থগিত রেখেছিলাম। এক মাস পর ছোট একটি ইউনিট নিয়ে কাজে ফিরেছিলাম এবং মাত্র এক দিনেই সব প্রয়োজনীয় দৃশ্যের শুটিং করে ফেলি।
আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
অনেক ধন্যবাদ।





