বোরহানের মানবসেবার হাতিয়ার ফেসবুক

অসুস্থ শিশুর জন্য সহায়তা চেয়ে ফেসবুকে ভিডিও প্রচার করেন সাঈদ বোরহান উদ্দিন খান
একটি ফেসবুক ভিডিও আর তাতেই ফেরে বাঁচার আশা। কারও হার্টের অপারেশন, কারও মেরুদণ্ডের টিউমারের চিকিৎসা, আবার কারও মাথা গোঁজার ঠাঁই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে মানবসেবার হাতিয়ার বানিয়েছেন হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার পশ্চিম মাধবপুর মহল্লার সাঈদ বোরহান উদ্দিন খান।
মাসতিনেক আগে উপজেলার বুল্লা ইউনিয়নের মাহমুদপুর গ্রামের রিকশাচালক ফারুক মিয়ার শিশুকন্যা তাবাসসুম আক্তারের হৃৎপিণ্ডে ছিদ্র ধরা পড়ে। জরুরি অস্ত্রোপচারের জন্য টাকা জোগাড় করতে না পেরে পরিবারটি দিশাহারা হয়ে পড়ে। বিষয়টি জানতে পেরে সাঈদ বোরহান তাবাসসুমকে নিয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। তা দেখে দেশ-বিদেশের মানুষ প্রায় ২ লাখ টাকা পাঠান। সেই অর্থে চিকিৎসা শেষে এখন তাবাসসুম সুস্থ।
মাধবপুর সৈয়দ সাঈদ উদ্দিন ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী আশা রানীর মেরুদণ্ডে টিউমারের চিকিৎসার জন্য বোরহানের করা ভিডিও ৭০ লাখের বেশি মানুষ দেখেছেন। পরে প্রায় ৪ লাখ টাকা সংগ্রহ হয়। চিকিৎসা শেষে আশা এখন নিয়মিত কলেজে যাচ্ছেন।
বোরহান ২০১৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ফেসবুকে ভিডিও প্রচারের মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে এতিম, প্রতিবন্ধী ও দরিদ্রদের জন্য ১৩টি ঘর নির্মাণে সহযোগিতা করেছেন। বর্তমানে চলছে ১৪তম ঘরের কাজ। এ ছাড়া ২৫০ থেকে ৩০০ অসহায় মানুষের চিকিৎসা ও বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় এ পর্যন্ত ব্যয় করেছেন ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা।
৩৩ বছর বয়সী সাঈদ বোরহান ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর এবং পরে বিজিএমইএর অ্যাপারেল মার্চেন্ডাইজিং বিভাগ থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেন। ঢাকা ও মাধবপুরে তার দুটি কাপড়ের দোকান রয়েছে।
সাঈদ বোরহান জানিয়েছেন, তার ফেসবুক আইডিতে ১ লাখ ৮১ হাজার অনুসারী আছেন। তাদের পাঠানো অর্থ সরাসরি উপকারভোগীর হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়। তার সঙ্গে জহির, হৃদয়, জাহাঙ্গীর, মামুন, জাকির, তৌহিদসহ ১০-১২ জনের একটি দল স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছে। তার মা সালমা খানমও এ কাজে সবসময় পাশে থাকেন। বাবার পেনশনের টাকা, বাড়িভাড়ার আয় ও ব্যবসার লাভের একটি অংশ ব্যয় করেন মানবসেবায়। কয়েক মাস পরপর মা-ছেলে মিলে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে শতাধিক অসহায় মানুষকে রান্না করা খাবার বিতরণ করেন।
সাঈদ বোরহানের মা বললেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে ছেলে বোরহানকে নিয়ে অসহায় মানুষের পাশে আছি। সাঈদের বন্ধুদের সহযোগিতায় আমরা মাঝেমধ্যে রান্না করা খাবার বিতরণ করি।’
শিক্ষার্থী আশা রানীর ভাষায়, ‘বোরহান ভাইয়ের ফেসবুক ভিডিওর কারণেই মানুষের সহযোগিতা পেয়েছি। এখন সুস্থ হয়ে আবার কলেজে যেতে পারছি।’
তাবাসসুমের বাবা ফারুক মিয়া বলছিলেন, ‘রিকশা চালিয়ে মেয়ের চিকিৎসা করানো সম্ভব ছিল না। বোরহান ভাইয়ের ভিডিওর পর মানুষের সহযোগিতায় আমার মেয়ে নতুন জীবন পেয়েছে।’ ছাতিয়াইন বিশ্বনাথ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রাক্তন শিক্ষক কামরুল খানের ভাষ্য, বোরহান তার বাবার মৃত্যুর পর থেকেই মানুষের কল্যাণে কাজ করছেন।
মাধবপুরের কালিকাপুর দরিদ্রকল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ‘সাঈদের ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে মানুষের সহযোগিতা নিয়ে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগটি অনুকরণীয়।’
মাধবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ বলেছেন, সাঈদ বোরহান ফেসবুকে মানবিক সহায়তা চেয়ে যেসব ভিডিও প্রকাশ করছেন, তা দেশ-বিদেশে ব্যাপক সাড়া জাগাচ্ছে। তার এ কাজের মাধ্যমে অনেক মানুষ উপকৃত হচ্ছেন।
মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেহেদী হাসান বললেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে
মানবসেবার কাজে ব্যবহার করে সাঈদ বোরহান অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছেন।’




