হাসপাতালে কাতরাচ্ছে দুই শিশু, জানে না মারা গেছে মা

বান্দরবান সদর হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি দুই ভাই জনওয়াই ম্রো এবং কাইংওয়াই ম্রো। ছবি: সংগৃহীত ছবি
বান্দরবান সদর হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড। আরো ডজন ডজন শিশুর মতই হাতে, পায়ে, পিঠে স্যালাইনের পাইপ লাগিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছে চার বছরের জনওয়াই ম্রো এবং দুই বছরের কাইংওয়াই ম্রো।
এতদিন হাসপাতালে মায়ের কোলেই ছিল ওরা। এখনো চিকিৎসা নিচ্ছে ওই হাসপাতালেই। এখনো জানে না, তাদের মা আর কোনো দিন ফিরে আসবেন না। মায়ের অপেক্ষায় এখনো হাসপাতালের বেডে চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে তারা। কখনো কাকা, কখনো মামার কোলে থাকলেও তারা খুঁজে ফিরছে মায়ের স্নেহের পরশ।
এই দুই শিশুর বাড়ি বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম গ্যালেঙ্গা চিনিপাড়ায়। এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে সন্তানদের চিকিৎসার জন্য প্রায় এক সপ্তাহ আগে তাদের বাবা ক্রংসং ম্রো (২৫) ও মা লেংরুম ম্রো তাদের নিয়ে আসেন বান্দরবান সদর হাসপাতালে।
হাসপাতালে চিকিৎসক ও নার্সদের সেবায় দুই শিশুর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে থাকলেও টানা দিন-রাত হাসপাতালে থেকে সন্তানদের দেখভালের ধকল সইতে পারেননি লেংরুম ম্রো। গত ২৭ জুলাই হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা।
তবে ভাষাগত সীমাবদ্ধতা, দারিদ্র্য এবং যাতায়াত ব্যয়ের সামর্থ্য না থাকায় স্বামী ক্রংসং ম্রো তাকে চট্টগ্রামে নিতে রাজি হননি। উন্নত চিকিৎসার পরিবর্তে গ্রামের বৈদ্যের মাধ্যমে চিকিৎসার আশায় স্ত্রীকে বাড়িতে নিয়ে যান। ২৯ জুলাই সন্ধ্যায় বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই লেংরুম ম্রোর মৃত্যু হয়। পরদিন পারিবারিকভাবে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
১ আগস্ট লেংরুম ম্রোর মৃত্যুর খবর পৌঁছায় বান্দরবান সদর হাসপাতালে। তখনও দুই শিশু মাকে খুঁজছিল। বর্তমানে তাদের চিকিৎসা ও দেখভালের দায়িত্ব পালন করছেন কাকা ক্রংতং ম্রো ও মামা পায়াং ম্রো।
হাসপাতালে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ক্রংতং ম্রো। তিনি জানান, ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে গেলে হয়তো ভাবীকে বাঁচানো যেত।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এলাকার মানুষ এবারই প্রথম বান্দরবান জেলা সদরে এসেছে। চট্টগ্রাম কোথায়, কত দূরে, আমরা জানি না। বড় ভাই বাংলা ভাষা বলতে পারেন না। হাতে টাকা-পয়সাও নেই। সে কারণেই বৈদ্য-কবিরাজ ছাড়া আমাদের উপায় কী?’
জানা যায়, হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত রুমা উপজেলায় নয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তারা হলো ফ্রেলেএং খুমী (৫), খ্রেপা খুমী (১১), শইফ্রা খুমী (৫), প্রেটেম এং খুমী (৬), পলিএং খুমী (৯), প্রেটেমএং খুমী (৭), পও এং খুমী (৭), কুপাও ম্রো (১৩) এবং সুইডেন সাং বম (১৫)।




