চার্টার্ড ফ্লাইটে চুরি ৪৬৮ কোটি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকা-গুয়াংজু-ঢাকা রুটে চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনার নামে ‘পুকুরচুরি’ করেছে বিমানের একটি সিন্ডিকেট। ১৭৪টি রাউন্ড ট্রিপ ফ্লাইট পরিচালনা করে লুটে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৪৬৮ কোটি টাকা। শুধু প্রতিটি ফ্লাইটের ভাড়া থেকেই আত্মসাৎ করা হয়েছে প্রায় পৌনে ৩ কোটি টাকা। চুক্তি অনুসারে বাতিল ফ্লাইটের জন্য জরিমানার ৬৩ কোটি টাকারও কোনো হদিস নেই। একইভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে প্রণোদনার সাড়ে ৬ কোটি টাকা। নিয়ম অনুযায়ী এ অর্থ জমা হওয়ার কথা বিমানের তহবিলে। ব্যাপক এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িতরা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসেরই বিভিন্ন ধাপের কর্মকর্তা। সংস্থাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, বিশাল অঙ্কের এ দুর্নীতির ঘটনা ধরা পড়ে গত বছর মে মাসে বিমানের এক অভ্যন্তরীণ তদন্তে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলেও তখন বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে। শুধু তাই নয়, এ দুর্নীতিতে জড়িত সিন্ডিকেটের ‘হোতা’ হিসেবে চিহ্নিত বিমানের প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক এবং মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. মিজানুর রশীদকে শাস্তির বদলে দেওয়া হয়েছিল পদোন্নতিও। গত ১৮ মে নির্বাহী পরিচালক পদে তার পদোন্নতির ঘটনায় ব্যাপক হইচই দেখা দিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা বাতিল করা হয়। পরদিন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় চাকরি থেকে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মিজানুর রশীদের দুর্নীতি ও জালিয়াতির ঘটনা শেষ পর্যন্ত ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায়নি। একপর্যায়ে বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নজরে এলে দ্রুত পাল্টে যায় প্রেক্ষাপট। বিমান কর্তৃপক্ষ নতুন করে মিজানুর ও তার সহযোগীদের দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শিগগিরই কমিটি কাজ শুরু করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধান করছে।
দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মিজানুর রশীদের মোবাইল ফোন নাম্বারে গতকাল বুধবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। একই নাম্বারের হোয়াটসঅ্যাপে কথা বলার জন্য সময় চেয়ে খুদে বার্তা পাঠালেও সাড়া মেলেনি। সবশেষ সন্ধ্যা ৭টায় হোয়াটসঅ্যাপে তার বক্তব্য চেয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠালেও রাত ৯টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে বিভিন্ন মাধ্যমে চেষ্টা করেও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার বক্তব্য পেতে গতকাল বিকালে বিমানের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) বোসরা ইসলামের সঙ্গে কথা বললে তিনি প্রতিবেদককে লিখিত প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। বিকাল ৪টা ৫৮ মিনিটে তার মোবাইল নাম্বারের হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠালেও রাত ৯টা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
বিমানের অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, কভিড-১৯ মহামারীর কারণে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটায় ধস নামে বিমানের রাজস্ব আয়ে। টিকে থাকার চেষ্টায় সংস্থাটি ২০২০-২১ অর্থবছরে বিভিন্ন রুটে নন-শিডিউল চার্টার্ড কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার চুক্তি করে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের কার্গো কোম্পানির সঙ্গে নির্দিষ্ট ফি, সিকিউরিটি ডিপোজিট, ক্যান্সেলেশন পেনাল্টি, হ্যান্ডলিং চার্জসহ অন্যান্য চার্জ ঠিক করে ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। আর এ খাতের রাজস্ব-সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সংরক্ষণের জন্য গঠন করা হয় চার্টার্ড সেল নামে একটি বিভাগ।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ বিমান ঢাকা থেকে চীনের গুয়াংজু রুটে ১৭৪টি রাউন্ড ট্রিপ চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা করে। বিমান ও চীনের জিএসএ কোম্পানি সুপার পাওয়ার লিমিটেডের (এসপিএল) মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী ফ্লাইটপ্রতি ভাড়া নির্ধারিত ছিল ৩ লাখ মার্কিন ডলার (তখনকার সময়ে প্রতি ডলার ১২০ টাকা হারে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা)। কিন্তু বিমানের তহবিলে প্রতি ফ্লাইটের ভাড়া হিসাবে জমা হয়েছে মাত্র ৭৬ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৯১ লাখ ২০ হাজার টাকা)। এ হিসাবে প্রতি ফ্লাইটের ভাড়া থেকে লোপাট করা হয়েছে ২ কোটি ৬৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা। ১৭৪টি ফ্লাইট থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ৪৬৭ কোটি ৭১ লাখ ২০ হাজার টাকা। বিপুল এ অর্থ লোপাট করতে এসপিএলের সঙ্গে চুক্তির জাল কপি ব্যবহার করেছে চক্রটি। মূল চুক্তিতে প্রতি ফ্লাইটের জন্য ৩ লাখ ডলার ভাড়া উল্লেখ থাকলেও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা চুক্তিতে ভাড়া দেখানো হয়েছে ৭৬ হাজার ডলার। বিমানের ব্যাংক হিসাবে তারা এ পরিমাণ টাকা জমা করেছে। বাকিটা চলে গেছে সিন্ডিকেটের পকেটে।
বিমানের অভ্যন্তরীণ তদন্তে উঠে এসেছে, সংস্থাটির লন্ডনের ব্যাংক হিসাব ও ব্যাংককের ব্যাংক হিসাবে গুয়াংজু থেকে ১ কোটি ৩১ লাখ মার্কিন ডলার জমা হয়েছে। এটাই বিমানের রাজস্ব হিসাবে দেখানো হয়েছে। অথচ চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া বাবদ ব্যাংকে জমা হওয়ার কথা ছিল ৫ কোটি ২২ লাখ ডলার।
এ ছাড়া শিডিউলে থাকলেও ১৫২টি ফ্লাইট বাতিল করে দিয়েছিল সুপার পাওয়ার লিমিটেড। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সেসব ফ্লাইট বাতিলের জরিমানা হিসাবে বিমানের অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার কথা ছিল ৫২ লাখ ৮২ হাজার মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬৩ কোটি ৩৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা)। কিন্তু এ বাবদে একটি টাকাও জমা পড়েনি। অন্যদিকে চুক্তি অনুযায়ী বিমানের এসব চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনার জন্য চীন সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা পাওয়ার কথা ছিল ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু ওই টাকারও কোনো হদিস মেলেনি। রাজস্ব শাখার তথ্য অনুযায়ী বিমানের রাজস্ব বিভাগ কিংবা গুয়াংজু স্টেশন থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো হিসাবপত্র পাওয়া যায়নি। অথচ বিমান ও এসপিএলের চুক্তির আর্টিকেল-৭-এর প্যারা ৩-এ উল্লেখ আছে, জিএসএর সংরক্ষিত সব তথ্য ও হিসাব বিমানের অনুমোদিত কর্মকর্তাকে সরবরাহ করতে হবে। কিন্তু চুক্তির এ ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে।
এদিকে এত অপকর্মের পরও মিজানুর রশীদকে গত ১৮ মে বিমানের নির্বাহী পরিচালক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠলে ওইদিনই পদোন্নতির আদেশ বাতিল করা হয়। পরদিনই তাকে চাকরি থেকে করা হয় সাময়িক বরখাস্ত। একই সঙ্গে তার দুর্নীতির ঘটনা তদন্ত করতে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তারা মনে করেন, নতুন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে নিবিড় তদন্ত চালালে বিমানের টিকিট বিক্রিতে জালিয়াতি, বিভিন্ন খাত থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ, মানি লন্ডারিং ও কানাডায় মানব পাচারসহ চাঞ্চল্যকর সব দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসবে।
অন্যদিকে দুদক সূত্র জানিয়েছে, অনেক আগে থেকেই মিজানুর রশীদের দুর্নীতির অনুসন্ধান করছে দুদকের দুই সদস্যের একটি দল। এর প্রধান হচ্ছেন সংস্থাটির উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম। গত ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিমানের মহাব্যবস্থাপক (অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা) আব্দুর রহমান ফারুকী, মহাব্যবস্থাপক (আইটি) মো. আনোয়ারুল হক ও ব্যবস্থাপক (অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা) মো. নাজমুল করিমের বিরুদ্ধে বিমানের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত চেয়ে বিমানকে চিঠি দেন।
জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আখতারুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘মোহাম্মদ মিজানুর রশীদ ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনুসন্ধান চলমান রয়েছে। তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে, অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে আর কিছু বলা সম্ভব নয়।’




