নেইমারেই ফিরবে সাম্বার ছন্দ

২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর ব্রাজিলের হয়ে সর্বশেষ ম্যাচ খেলেছিলেন নেইমার। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ফিরতে পারেন তিনি
রিও ডি জেনিরোর রাস্তায় নাইকির বিশাল বিলবোর্ড। সাদা পোশাকে পা দুটি সামনে এলিয়ে দিয়ে বসা মডেল। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে হলিউডের কোনো সুপারস্টার। ওই রাস্তায় যাত্রী পরিবহনের গায়েও একই মডেল। কোনো শপিং মলে ঢুকতে যাবেন, সেখানেও একই মুখ। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ আয়োজক দেশের সর্বত্র চোখে পড়েছিল একই দৃশ্য।
তিনি হলিউডের কোনো নায়ক নন। নামি মডেলও নন। বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনে ছেয়ে থাকা ওই মানুষটি নেইমার। ব্রাজিলিয়ানদের কাছে তিনি নায়ক, সুপারস্টার, মডেল, আশা-ভরসা— সবকিছু। সময়ের ডানায় চেপে একযুগ পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনো ব্রাজিলিয়ানদের কাছে ঠিক তাই। চোটের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ, মাঠ ও মাঠের বাইরের বিতর্ক, বয়সের ভার, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনে সেই নেইমার আর নেই। তবু সাম্বার দেশের মানুষ বিশ্বকাপ স্বপ্ন বুনেছেন তাকে ঘিরে। সে কারণেই হয়তো কার্লো আনচেলত্তির দল ঘোষণার সময় নেইমার নাম উচ্চারিত হতেই আনন্দে ফেটে পড়েছিল গোটা ব্রাজিল।
নেইমারের ফর্ম নেই। সান্তোসে জার্সিতে মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরে বেশি সময় কাটাতে হয়েছে। এরপরও নেইমারকে নিয়ে ব্রাজিলিয়ানদের এত উচ্ছ্বাস কেন? এজন্য একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ব্রাজিলের সর্বশেষ জেতা ২০০২ বিশ্বকাপের স্কোয়াডের কয়েকটি নাম মনে করুন। রোনালদো, রোনালদিনহো, রিভারলদো, রবার্তো কার্লোস, কাফু... একজনের ওপর আরেকজন সুপারস্টার। এরপর অপার সম্ভাবনা নিয়ে এলেন রবিনহো। ইনজুরি ও অনিয়ন্ত্রিত জীবন তার ক্যারিয়ারেও টেনে দেয় দাঁড়িচিহ্ন। পরের সময়টায় নেইমার ছাড়া ওই মানের খেলোয়াড় হাতড়েও খুঁজে পাবেন না। আলোকবর্তিকা হাতে একাই পথ দেখিয়ে গেছেন ৩৪ পেরোনো এ ফরোয়ার্ড।
বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ফুটবলার সরবরাহ করার তালিকায় শীর্ষে ব্রাজিল। ইউরোপিয়ান ফুটবল মাতিয়ে রাখেন ব্রাজিলিয়ানরা। প্রতিভার ঝলক দেখিয়ে অনেকে শৈশবেই পাড়ি জমান ইউরোপের নামি ক্লাবগুলোতে। তবু নেইমারের ব্যতিক্রম তৈরি হয়নি। এখানে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের নাম আসতে পারে। নিঃসন্দেহে রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে তিনি অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু ব্রাজিলেও কি তাই? না, হলুদ জার্সিতে কালেভদ্রে দেখা যায় তার ঝলক।
ওই রিয়ালকে সব জেতানো কার্লো আনচেলত্তির নাম কোচ হিসেবে ঘোষণা হতেই ব্রাজিলিয়ানদের মুখে চওড়া হাসি— এবার তাহলে হবে হেক্সা জয়। ইতালিয়ান ট্যাকটিশিয়ান এসেছেন বলেই বিশ্বকাপ জয়ের আশা বড় হয়েছে, ব্যাপারটা এমন নয়। লাতিন দেশটির ফুটবলপাগল মানুষ নেইমারকে ঘিরে যে স্বপ্ন দেখছিলেন, সেখানে আনচেলত্তির উপস্থিতি দৃঢ় করেছে বিশ্বাস। অর্থাৎ, নেইমারকে ছাড়া ব্রাজিলকে চিন্তাও করেননি তারা।
আনচেলত্তিও কি নেইমারকে ছাড়া চিন্তা করেছেন এবারের বিশ্বকাপ? খুব সম্ভবত না। কারণ, অর্ধেক ফিট থাকার পরও এ ফরোয়ার্ডকে বিশ্বকাপের দলে রাখতেন না। অবশ্য এও আলোচনায় আছে, সান্তোস নাকি নেইমারের চোটের বিষয় চেপে গিয়েছিল। সে যাই হোক, আনচেলত্তির মতো বিচক্ষণ ও অভিজ্ঞ কোচ আড়াই বছরের বেশি সময় দলের বাইরে থাকা একজন খেলোয়াড়কে শুধু আবেগ আর বাইরের চাপে যে দলে নেননি, তা বলাই যায়।
এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের প্রথম দুই ম্যাচে দলটির সমর্থকরাই হতাশ। তালগোল পাকিয়েছে দুটি ম্যাচেই। হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয় পেলেও ব্রাজিলের সেই সুন্দর ফুটবল চোখে পড়েনি। বছরের পর বছর দেখে আসা আনচেলত্তির ফুটবল দর্শনও ফুটে ওঠেনি। মনে হয়েছে, সব ঠিক হতে হতেও হচ্ছে না। কিছু একটা মিসিং। সেটিই নেইমার। ব্রাজিলের এক্স-ফ্যাক্টর। তার উপস্থিতিই পাল্টে দিতে পারে ব্রাজিলকে। মাঠে তৈরি করতে পারে অন্য আবহ। ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর ব্রাজিলের জার্সিতে তিনি ফিরছেন অবশেষে। স্কটল্যান্ড ম্যাচে বদলি হয়ে ম্যাচের কোনো একটা সময় নামবেন মাঠে।
ব্রাজিলের ড্রেসিংরুমের চেহারা নাকি এরই মধ্যে পাল্টে গেছে। রাফিনিয়ার চোটের দুঃখ ভুলে নেইমারকে নিয়ে মেতেছে ভিনি-এনদ্রিকরা। আর সব ব্রাজিলিয়ানের মতো তারাও যে খুব করে বিশ্বকাপে চেয়েছেন নেইমারকে।





