স্টপেজ টাইমে গোল ২৯, কিন্তু বাড়ছে কেন..
- স্টপেজ টাইমে মোট গোল ২৯, ম্যাচ প্রতি ০.২৬ গোল
- প্রতি ম্যাচে স্টপেজ টাইম গড়ে ১৪ মিনিটেরও বেশি

এবার স্টপেজ টাইম বড় নির্মম। ৯১ মিনিটের গোলে রোনালদোকে বিদায় করে দিয়েছে বিশ্বকাপ মঞ্চ থেকে
ম্যাচ ৯০ মিনিট পার করছে, রোনালদোর বিশ্বকাপ ভাগ্য নির্ধারিত হবে অতিরিক্ত সময় অর্থাৎ ১২০ মিনিটের খেলায়। কিন্তু তা হয়নি। ৯১ মিনিটের মাথায় স্পেনের মিকেল মেরিনোর গোলে শেষ হয়ে গেল ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ। আর কখনো বিশ্বকাপ মঞ্চে দেখা যাবে না পর্তুগীজ ফুটবল রাজপুত্রকে।
ইশ্.. পর্তুগাল যদি বুঝতে পারতো গোলের আসল খেলাটা শুরু হয় স্টপেজ টাইম বা অ্যাডেড টাইমে! এটাই এই বিশ্বকাপের ট্রেন্ড। ৯০ মিনিটের পর যোগ করা সময়ের গোলে ম্যাচের নিষ্পত্তি হচ্ছে। মেরিনোর গোলসহ মোট ২৯ গোল হয়েছে এই সময়ে। ম্যাচ প্রতি গড়ে ০.২৬টি গোল। এই বিশ্বকাপে স্টপেজ টাইম মানেই ম্যাচের নাটকীয় সমাপ্তির সম্ভাবনা।
ম্যাচের নির্ণায়ক স্টপেজ টাইমের গোল
পর্তুগাল ব্যাপারটা আগে থেকে অনুমান করতে না পারলেও অনেক দল এই সময়টাকে নিয়ে আলাদা করে কৌশল আঁটে। কোচ তার ফরমেশন বদলে ফেলেন। যেমন ২৯ জুন ৯২ মিনিটে স্টিফেন ইউস্তাকিউর গালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে কানাডা পৌঁছ যায় শেষ ষোলোতে। এরপর কানাডার কোচ জেসি মার্শ বলেছিলেন, ‘গোলটির সময় এই জয়কে অবিশ্বাস্য নাটকীয় মোড় দিয়েছে। এর জন্য আপনাকে প্রস্তুত থাকতে হবে।’ এই প্রস্তুতির কারণে যোগ করা সময়ে গোল সংখ্যা বেড়ে ২৯ এ দাঁড়িয়েছে।
এই স্টপেজ টাইমের কথা মাথায় রেখে কোচরাও মাঠে নামান ভালো গতির ফুটবলারদের যেন ক্লান্ত প্রতিপক্ষকে সহজে পরাস্ত করা যায়। তা ছাড়া প্রতিপক্ষ রক্ষণও শেষদিকে মনঃসংযোগ হারিয়ে ফেলে। পুর্তাগলের বিপক্ষে স্প্যানিশ কোচ দে লা ফুয়েন্তে নামিয়েছিলেন ফরোয়ার্ডের দুই খেলোয়াড় ফেরান তরেস ও মিকেল মেরিনোকে। তারাই ৯১ মিনিটে বের করে দিয়েছেন ম্যাচটা, তরেসের দুর্দান্ত থ্রু বলে মেরিনোর গোলে কোয়ার্টার ফাইনালের দুয়ার খুলে যায় স্পেনের।
স্টপেজ টাইমও এখন দীর্ঘ
গত তিন দশকে বিশ্বকাপ ম্যাচে স্টপেজ টাইমের সময় প্রায় চার গুণ বেড়েছে। ১৯৯০ সালে যেখানে গড়ে প্রায় ৩ মিনিট ইনজুরি টাইম যোগ হতো, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১.২ মিনিটে। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে ম্যাচগুলোতে প্রতি ম্যাচে গড়ে ১৪ মিনিটেরও বেশি অতিরিক্ত সময় যোগ করা হচ্ছে। ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দেরিতে ম্যাচ শেষ হয়েছে ১০৯ মিনিটে।
শুধু দ্বিতীয়ার্ধের অতিরিক্ত সময়ই এবার গড়ে ৭ মিনিটের বেশি, যেখানে তার আগের দুই বিশ্বকাপে তা ছিল প্রায় ৪ থেকে ৫ মিনিট। ম্যাচ দীর্ঘ হওয়ায় গোলের সুযোগও বেড়েছে। এগিয়ে থাকা দলগুলোকে দীর্ঘ সময় ধরে তাদের লিড ধরে রাখতে হয়, আর পিছিয়ে থাকা দলগুলো সমতা ফেরানো বা জয়ের জন্য পায় বেশি সময়। তাই অনেক ম্যাচে স্টপেজ টাইমেই নাটকীয় মোড় নেয়।
৯০ মিনিটের পর গোলের সংখ্যা বাড়লেও, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে দেখা সবচেয়ে দেরিতে হওয়া গোলের রেকর্ড এখনো ভাঙা যায়নি। সেটি ছিল ১০৩ মিনিটে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করেছিল ইরান।
নষ্ট করা সময় যোগ হচ্ছে অজান্তেই
খেলোয়াড়রা যতভাবে সময় নষ্ট করুক, সেটা যে রেফারির ঘড়িতে মিনিট-সেকেন্ডে যোগ হয়ে যাচ্ছে স্টপেজ টাইম হয়ে। বদলির সময় আস্তে আস্তে হেঁটে মাঠ ছেড়েও লাভ নেই। এ ছাড়া ভিএআর পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, চোটের কারণে খেলোয়াড়ের মাঠে গড়াগড়ি খাওয়া, হাইড্রেশন ব্রেক ও গোল উদযাপনে নষ্ট হওয়া সময় হিসাব করেই স্টপেজ টাইমে ঢুকে যায়। তাতে অনেক সময় ১০ মিনিটেরও বেশি স্টপেজ টাইম দেওয়া হয়। তাই গোলের সংখ্যাও বাড়ছে দ্বিতীয়ার্ধে। আগে প্রথামর্ধেই হতো অনেক গোল। এখন প্রথমার্ধের সেই সংখ্যাটা মোট গোলের ৪০ শতাংশেরও নীচে চলে এসেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে গোল বেড়েছে দ্বিতীয়াার্ধে।
বেড়েছে শেষদিকের গোল সংখ্যা
শুধু স্টপেজ টাইম নায়, ৭৬ মিনিট থেকে ধরলে ম্যাচের ইনজুরি টাইমের শেষ পর্যন্ত-- শেষদিকে গোলের হারও আনেক বেশি। মোট গোলের এক চতুর্থাংশ হয়েছে এই সময়ে। এটা বেশ চোখে পড়ার মতোই। অন্যান্য বিশ্বকাপের সঙ্গে তুলনা করলে এবার শেষদিকে হওয়া গোলের পরিসংখ্যানটা অবাক করার মতো। এই শতকের ২০০৬ বিশ্বকাপ বাদে অন্যান্য আসরে মোট গোলের ২৩-২৪ শতাংশ থাকতো শেষদিকের গোল (৭৬ মিনিট থেকে স্টপেজ টাইমের শেষ পর্যন্ত)। এবার সেটা বেড়ে হয়েছে ২৯.২ শতাংশ। কেবল ২০০৬ বিশ্বকাপে শেষদিকে গোলের হারটা সবচেয়ে বেশি ছিল, মোট গোলের ৩০.৬ শতাংশ।
দ্বিতয়ার্ধে হাইড্রেশন ব্রেক থেকেই বেড়ে যায় গোলের সম্ভাবনা। তবে স্টপেজ টাইম বা অ্যাডেড টাইমে গিয়ে লড়াইটা কখনো একপেশে হয়ে যায়। এই সময়টা বেশি হওয়ায় তখন প্রেসিংয়ের তীব্রতা বাড়ে এবং খেলোয়াড়দের ক্লান্তি ও রক্ষণভাগে ভুলের সুযোগ বাড়ে, ফলে গোলও বাড়ছে।




