বিশ্বমঞ্চে দুই প্রজন্মের নতুন দ্বৈরথ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রায় এক যুগ ধরে ফুটবল বিশ্বকে বুঁদ করে রেখেছিল লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মহাকাব্যিক দ্বৈরথ। দুজনেরই বয়স বেড়েছে, ক্যারিয়ার এখন গোধূলিলগ্নে। তবে ফুটবল বিধাতা যেন শেষ বেলায় সব জাদু তুলে দিয়েছেন মেসির পায়ে। আটটি ব্যালন ডি’অর, টানা দুটি কোপা আমেরিকা আর কাতার বিশ্বকাপে সেই বহু আরাধ্য ট্রফি ছুঁয়ে রোনালদোকে বহুদূর পেছনে ফেলেছেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। এমনকি বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডটাও এখন তার দখলে। রোনালদো যখন বয়সের ভারে কিছুটা ম্লান, তখন বিশ্বমঞ্চে মেসির রাজত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন ফরাসি তরুণ কিলিয়ান এমবাপ্পে। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে আর মেসি-রোনালদো নয়, বরং দেখা যাচ্ছে ভিন্ন প্রজন্মের দুই মহাতারকার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই।
বিশ্বকাপের মঞ্চে গোল করাটা যেন ডালভাত বানিয়ে ফেলেছেন মেসি-এমবাপ্পে। একজন থামতে রাজী নন, অন্যজনও নাছোড়বান্দা। নরওয়ের বিপক্ষে গোল না পেয়ে সাময়িকভাবে একটু আড়ালে চলে গিয়েছিলেন ফ্রান্স অধিনায়ক এমবাপ্পে। তবে শেষ ৩২-এর ম্যাচে সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করে আবারও ফিরেছেন স্পটলাইটে। আর তাতেই বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার লড়াইয়ে মেসির একক আধিপত্যকে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছেন। জর্ডানের বিপক্ষে বেঞ্চ থেকে উঠে এসে দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিক গোল করেছিলেন মেসি। ওই চোখধাঁধানো গোলের সুবাদে ১৯ গোল নিয়ে বনে গেছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। বিশ্বমঞ্চে মেসির এই সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করা ফরাসি অধিনায়ক এখন মেসির চেয়ে মাত্র ১ গোল পিছিয়ে আছেন, যা বিশ্বমঞ্চে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইকে আরও জমজমাট করে তুলেছে। দুজনে এখন পর্যন্ত ছয়টি করে গোল করলেও গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে মেসিকে ছাপিয়ে গেছেন এমবাপ্পে। কারণ, এমবাপ্পের দুটি অ্যাসিস্ট থাকলেও মেসির নেই। অন্যদিকে তিন ম্যাচ খেলা রোনালদো একটি ম্যাচে জোড়া গোল করেছেন। গড়েছেন টানা ছয় বিশ্বকাপে গোল করার বিশ্বরেকর্ড। বাকি দুটিতে ছিলেন নিজের ছায়া হয়ে। পর্তুগাল শেষ বত্রিশে উঠলেও গোলউৎসবে পিছিয়েই আছেন ৯৭৫ গোলের মালিক সিআরসেভেন। ২৫ বছর বয়সী এমবাপ্পে এমনিতে রোনালদোভক্ত হিসেবে পরিচিত হলেও মেসির সঙ্গে খেলেছেন একই দলে। অবশ্য পিএসজির সেই দিনগুলো মেসির জন্য সুখকর ছিল না। দুজনের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠেছিল কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ফ্রান্সের হারের পর। লুসাইলের সেই শ্বাসরুদ্ধকর ফাইনালে মেসির জোড়া গোল আর এমবাপ্পের হ্যাটট্রিকের পর টাইব্রেকারে ফ্রান্সকে কাঁদিয়েছিলেন দিবু মার্তিনেস। সেই আসরে ৮ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন এমবাপ্পে। এক গোল কম নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন মেসি। বিশ্বকাপজয়ী মেসিকে ফরাসিরা ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। গ্যালারির বিষাক্ত দুয়ো আর পিএসজির ড্রেসিংরুমে ব্রাত্য হয়ে পড়ার গ্লানি সইতে না পেরে একপর্যায়ে প্যারিস ছাড়েন লিওনেল মেসি; নতুন ঠিকানা খুঁজে নেন মার্কিন মুলুকে। সময়ের ব্যবধানে এমবাপ্পেও প্যারিসের মায়া কাটিয়ে সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ঠিকানা খুঁজে নেন। দুই মহাতারকা দুই মহাদেশে চলে যাওয়ায় ক্লাব ফুটবলে তাদের সেই চিরচেনা দ্বৈরথে ছেদ পড়েছিল। তবে উত্তর আমেরিকার বিশ্বকাপ শুরু হতেই সবুজ গালিচায় ফের জমে উঠেছে মেসি ও এমবাপ্পের সেই শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় মেসির রাজত্ব ভাঙার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও নিজেকে দারুণভাবে সংযত রেখেছেন ২৫ বছর বয়সী এমবাপ্পে, ‘আমি নিশ্চিত, লিও মেসি আরও গোল করবে। তাই আমি সেদিকে খুব বেশি মনোযোগ দিচ্ছি না। বরং আমাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ এবং আমাদের লক্ষ্য নিয়ে ভাবছি। আমাদের মনোযোগ এখন বিশ্বকাপ ফাইনাল।’ টানা দুই আসর ধরে বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা ফ্রান্স এবারও অপ্রতিরোধ্য। তারকাবহুল দলটি এবারও শিরোপা জয়ের অন্যতম বড় দাবিদার। নক-আউটপর্বের সব হিসাব নিকাশ আর সমীকরণ ঠিকঠাক চললে আরও একটি ফ্রান্স-আর্জেন্টিনা অগ্নিগর্ভ ফাইনাল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। সে পর্যন্ত মেসি-এমবাপ্পের গোলের লড়াই উপভোগ করুক ফুটবলবিশ্ব। ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে আর হয়তো কখনই বিশ্বকাপে দেখা যাবে না, তবে এমবাপ্পের সামনে পড়ে আছে দীর্ঘ ক্যারিয়ার। তাই বিশ্বকাপে মেসির সর্বোচ্চ গোলের সাম্রাজ্য নিজের করে নেওয়া ফরাসি গতিদানবের জন্য স্রেফ সময়ের ব্যাপার।







