ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তি চুক্তি চায় না ইরানিরা

তেহরানের একটি সড়কে এক নারী ইরানের জাতীয় পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবি: রয়টার্স
টানা চার মাস ধরে (১ মার্চ থেকে) প্রতি রাতে যদি একটি রাস্তার চত্বরে যেতে বলা হয়, সেখানেই থাকতে বলা হয় পুরো রাত; আর ঠিক এই রুটিনেই যদি থাকতে হয় মাসের পর মাস— তবে কি বিনা পয়সায় কোনো ব্যক্তিগত ফায়দা না দেখে তা করবেন? উত্তর হ্যাঁ। যদি তা দেশের সার্বভৌমত্ব-সম্মান-স্বাধীনতা রক্ষা ও জাতির ঐক্যের প্রশ্নে হয়, তাহলে অবশ্যই হ্যাঁ। ঠিক এই দৃশ্যটিই এখন চোখে পড়ে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার প্রধান প্রধান মোড়গুলোতে। এক দিন, দুদিন করতে করতে ১২২ রাত ধরে চলছে এই বিক্ষোভ। লাখ লাখ মানুষ জড়ো হচ্ছে রাতের এ বিক্ষোভে। আপস (চুক্তি) নয়, আত্মসমর্পণ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের দাসত্ব নয় স্লোগানে টগবগ করে ফুটছে সারা দেশের রাজপথ।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এত কষ্ট সহ্য করে রাস্তায় আসা? কেন এতগুলো ঘণ্টা ধরে হাঁটুর ব্যথা নিয়ে প্রতি রাতে রাস্তা পাহারা দেওয়া? কেন আবারও পরের দিন রাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই ব্যথা নিয়ে রাস্তায় ছুটে যাওয়া? হ্যাঁ, এটিই দেশপ্রেম। এটিই প্রতিরোধ। এটিই বীরত্ব। এটিই ইমানের শক্তি আর সর্বোচ্চ নেতার প্রতি সর্বোচ্চ আনুগত্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলা শুরু হলে প্রথম দিনই সেই নৃশংসতার বলি হয় ইরানের মিনাব শহরের ‘শাজারেহ তাইয়েবাহ’ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা।
এরপর পৃথিবীর মানুষ মনে করেছিল, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। বাঙ্কারে চলে যাবেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। আগের ১২ দিনের যুদ্ধেও শোনা গিয়েছিল এই অপবাদ। তবে তিনি সরাসরি জানিয়ে দেন, ‘আমার দেশের মানুষ মিসাইলের নিচে থাকবে আর আমি বাঙ্কারে যাব, তা হতে পারে না।’ তিনি অত্যন্ত বীরত্বের সঙ্গে নিজের কার্যালয়েই অবস্থান করছিলেন। পরে সেটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হয়; এভাবে ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের নৃশংসতার চিহ্ন আঁকা হয়। সর্বোচ্চ নেতা এক বক্তব্যে তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘আমি যদি ময়দানে যাই এবং শহীদ হয়ে যাই, তবে ইরানি জাতি যেন ততক্ষণ পর্যন্ত ময়দান না ছাড়ে, যতক্ষণ না তারা পূর্ণাঙ্গ বিজয় অর্জন করে। ঠিক সেই নির্দেশেই তার শাহাদাতের পর থেকেই রাজপথে নেমেছে মানুষ। এখনো নামছে প্রতিদিন।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে ইরান তো বিজয়ী! তবে সাধারণ মানুষের মতে, তাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী এখনো পূর্ণাঙ্গ বিজয় আসেনি। কারণ, তারা সর্বোচ্চ নেতা হত্যার প্রতিশোধ চায়, যেহেতু সেটি ইরানের নির্ধারিত সময়সীমা (ডেডলাইন) ছিল। চুক্তি নয়, পূর্ণাঙ্গ ধ্বংস চায় ইসরায়েলের; পৃথিবীর মানচিত্র থেকে ইসরায়েলকে মুছে ফেলাটাই তাদের দৃষ্টিতে পূর্ণাঙ্গ বিজয়। তবে এক্ষেত্রে সরকারি মহলের এক অংশের সঙ্গে জনসাধারণের মতবিরোধ শুরু হয়। কারণ, সরকারি মহলের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিতে যেতে চায়, কিন্তু সাধারণ জনগণ তা চায় না। জনগণ শুধু তাদের পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ নেতা এবং বর্তমান সর্বোচ্চ নেতার নির্দেশ পালন করতে চায়, অন্য কারও নয়— তিনি যে-ই হোন না কেন, এমনকি খোদ প্রেসিডেন্ট হলেও। আর বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনিই এই আন্দোলন চালিয়ে যেতে বলেছেন। যতক্ষণ না ঘরে ফিরে যেতে বলবেন বা রাস্তায় আসা বন্ধ করতে বলবেন, এই মানুষগুলো তাদের সব কষ্ট ও প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে প্রতিনিয়ত এই যাত্রা জারি রাখবেন, এমনকি তা যদি ৩৬৫ দিনেও গিয়ে ঠেকে!
ইসরায়েলের তাদের এই ময়দান রক্ষার আন্দোলনের কয়েকটি দিক রয়েছে। প্রথমত, তারা শহীদ সর্বোচ্চ নেতার কথা মেনে চলতে চান। দ্বিতীয়ত, তারা রাস্তায় নেমে এসে তাদের সেনাবাহিনী এবং যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছেন তাদের উৎসাহিত করতে চান, যেন তারা আরও অনুপ্রেরণা পান এবং তাদের কাজ চালিয়ে যেতে পারেন। তৃতীয়ত, তারা মনে করেন যে বাইরে এসে একতা প্রদর্শন করলে শত্রু আরও দুর্বল হবে। আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, তাদের সরকারের একটি বিশেষ মহল যেন মানুষের কষ্ট ও প্রতিকূলতার দোহাই দিয়ে বন্ধ করতে না পারে যুদ্ধ। চতুর্থত, রাস্তা খালি থাকলে জানুয়ারি মাসে যেভাবে পাহলভি সমর্থক এবং সন্ত্রাসীরা রাস্তায় সহিংসতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল, তা যেন আর ফিরে না আসে। সেজন্যও রাস্তার প্রহরী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন নিজেরাই। একই সঙ্গে তারা পুলিশ ও সেনাবাহিনীর কাজকে সহজ করে দিয়েছে। পঞ্চমত, এই দিকটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়। ইরানি জনগণ মনে করে, তারা এভাবে ইমাম মাহদির আগমনের পথ তৈরি করছে। তারা নিজেদের সর্বোচ্চকে ‘লাব্বাইক (উপস্থিত) বলার মাধ্যমে ইমাম মাহদির জন্য সেনাবাহিনী তৈরি করছে। এই লক্ষ্যে তারা একটি বিশেষ অফিসিয়াল ওয়েবসাইটও তৈরি করেছে, যার নাম ‘জান ফাদা’ অর্থাৎ ‘জীবন উৎসর্গ’ এবং সেখানে এরই মধ্যে ৩০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছে। আইআরজিসি বলছে, এটি ইরানি সেনাবাহিনী এবং ইমাম মাহদির সেনাবাহিনী। এই লক্ষ্যে তারা প্রতিটি রাস্তায় বুথ বসিয়েছে এবং মানুষজন নিজেদের সামর্থ্য, শক্তি, মেধা ও যুদ্ধকালীন কে কী কাজ করতে পারবে, সে অনুযায়ী শ্রেণিভিত্তিক নিবন্ধন করছে। রাস্তায় ও টেলিভিশন চ্যানেলে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ হিসেবে বন্দুক চালানো শেখানো হচ্ছে। মোটের ওপর, তারা ইমাম মাহদির আগমন এবং ইসরায়েলকে উড়িয়ে দেওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মুছে ফেলার জন্য অত্যন্ত বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।




