সাক্ষাৎকার
ডাকসু নির্বাচনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় আমি অঙ্গীকারবদ্ধ

অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম। গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। সবসময়ই দেশের ক্রান্তিকালে অগ্রভাগে থেকেছে এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা। সার্বিক বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি লিটন ইসলাম
আগামীর সময়: ১০৬ বছরে বিশ্ববিদ্যালয় কতটা এগিয়েছে? আপনার মূল্যায়ন কী?
অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: ১০৬ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে অসংখ্য মেধাবী মানুষ, রাষ্ট্রনায়ক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক ও গবেষক উপহার দিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বিভিন্ন কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষ ও গবেষণার পরিবেশ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দলীয়করণের প্রভাব পড়েছে। এখন আমাদের লক্ষ্য শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়; শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং সুশাসনের সমন্বয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ ২০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাতারে নিয়ে যাওয়া।
আগামীর সময়: দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের অভিভাবকত্ব পাওয়ায় আপনার অনুভূতি কেমন?
অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ও শতবর্ষী বিদ্যাপীঠের দায়িত্ব আমার কাছে একটি বিশাল বোঝা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় নিয়ামত। আমার প্রধান লক্ষ্য হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুশাসন বা গুড গভর্নেন্স নিশ্চিত করা। আমি মনে করি, আমি একটি উত্তপ্ত চেয়ারে বসেছি, এ কারণে সবসময় চোখ-কান খোলা রেখে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে হবে। আমি দায়িত্ব উপভোগ করতে চাই না; বরং এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারাটাকেই আমার আসল কাজ ও সাফল্য বলে মনে করি।
আগামীর সময়: বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থী ও গবেষণাবান্ধব হিসেবে সাজাতে আপনার পরিকল্পনা জানতে চাই।
অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে সুশৃঙ্খল রাখার চেষ্টা করছি। আসলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক একটি প্রতিষ্ঠান। শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। যদি আমরা তাদের জন্য ভালো পরিবেশ, মানসম্মত ও সুষম খাবার, স্বাস্থ্যকর আবাসন এবং পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে না পারি, লাইব্রেরি ও অ্যাকাডেমিক সুবিধাগুলো ঠিকভাবে দিতে না পারি, তাহলে আমাদের দায়িত্ব পালনের কোনো অর্থ থাকে না। শিক্ষার্থীরা ভালো থাকলে তবেই মনে করব আমি আমার কাজ ঠিকভাবে করতে পেরেছি।
আগামীর সময়: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী যারা আওয়ামী লীগ এবং ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন, তাদের করা নানা অন্যায় কর্মকাণ্ডের দৃশ্যমান শাস্তির বিষয়ে আপনার পদক্ষেপ কী?
অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়, এটি আইন দ্বারা পরিচালিত একটি কাঠামো। এখানে কোনো অপরাধ ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তি দেওয়া সম্ভব হয় না; একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করেই সবকিছু করতে হয়।
একটি ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়া বেশ দীর্ঘ। এই প্রক্রিয়ার কারণেই অনেক সময় বিলম্ব হয়। তবে বর্তমানে যে তদন্ত কমিটিগুলো কাজ করছে, তাদের রিপোর্ট দ্রুত জমা দেওয়ার জন্য আমি নির্দেশনা দিয়েছি। বিশেষ করে, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টগুলো পাওয়া মাত্রই দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তদন্ত শাখাকে বলা হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, আগামী সিন্ডিকেট মিটিংগুলোয় আমরা অনেকগুলো বিষয়ের সমাধান করতে পারব।
আগামীর সময়: ডাকসুর মেয়াদ তো শেষের দিকে। নির্বাচনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় আপনার পরিকল্পনা কী?
অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোতে হবে। আমি সব ছাত্র সংগঠনের সহযোগিতা কামনা করছি এবং আশা করি, তারা এই নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন করতে আমাদের পাশে থাকবে।
আগামীর সময়: অতীতে আমরা দেখেছি শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা কর্মচারী নিয়োগে যোগ্যতার চেয়ে দলকে বেশি প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়গুলো উঠে এসেছিল। আপনার প্রশাসন এই ক্ষেত্রে কীভাবে এগোবে?
অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: আমি একজন শিক্ষক, এটাই আমার প্রথম পরিচয়। শিক্ষক হিসেবে আমি সবসময়ই শিক্ষকদের নিয়োগে স্বচ্ছতার দাবি করে এসেছি। আমরা চেষ্টা করেছি যেন যোগ্যতাকেই একমাত্র মাপকাঠি ধরা হয়। মেধা ও যোগ্যতাকে দলীয় বিবেচনার বাইরে রেখে মূল্যায়ন করা উচিত। এই অবস্থান থেকে আমি কখনো সরে আসিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পরও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সিলেকশন বোর্ড বা প্রমোশনসংক্রান্ত বিষয়গুলোয়, বিশেষ করে লেকচারার বা এন্ট্রি-লেভেলের নিয়োগে, আমি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছি, যেন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয় মেধাকে। আমি সবসময়ই বিশ্বাস করি, মেধাই আমাদের প্রধান ভিত্তি এবং সেই নীতিতেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
আগামীর সময়: আপনি বিএনপির রাজনীতি করছেন দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আপনি তো সবার অভিভাবক। একজন অভিভাবক হিসেবে কীভাবে কাজ করতে চান?
অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব একটি মতাদর্শ ও চিন্তা থাকে। কিন্তু চেয়ারে বসার পর আমি কতটা নিরপেক্ষ থাকতে পারছি, সেটাই আসল। আমি কী মতাদর্শে বিশ্বাস করি, সেটি মুখ্য নয়; মুখ্য হলো আমি দায়িত্ব পালনে কতটা ন্যায়সংগত থাকতে পারছি। এই চেয়ার আমাকে একটি দায়িত্ব দিয়েছে, সুশাসন নিশ্চিত করার দায়িত্ব। আমি রাজনীতি করি কি না, সেটি বড় কথা নয়। কিন্তু আমি কখনোই সুশাসন ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আপস করিনি। আমি সবার অভিভাবক।
আগামীর সময়: আমাদের সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।




