তেলুগুতে বড় তারকারা কেন ঝুঁকছেন ছোট গল্পে?

সংগৃহীত ছবি
দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে—কোটি কোটি টাকার বাজেট, বিশাল সব সেট, আর নায়কের চোখ ধাঁধানো অ্যাকশন। বিশেষ করে তেলুগু সিনেমা বা টলিউড গত কয়েক বছর ধরে ‘প্যান-ইন্ডিয়া’ ব্লকবাস্টার বানানোর এক চেনা ফর্মুলায় আটকে ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই চেনা ছক ভেঙে এক নীরব বিপ্লব শুরু হয়েছে তেলুগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। বড় বড় সুপারস্টার থেকে শুরু করে নামী পরিচালকরা এখন বাণিজ্যিক মারপিটের মোহ ছেড়ে গল্প-চালিত সিনেমার দিকে ঝুঁকছেন।
গত মাসে মুক্তি পাওয়া এবং এই সপ্তাহে মুক্তির অপেক্ষায় থাকা ৪টি ভিন্ন ঘরানার সিনেমা—‘সিংগীতম’, ‘মা ইন্টি বাঙ্গারাম’, ‘রাও বাহাদুর’ ও ‘নাগাবন্ধম’ এই বড় পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পর পর মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাগুলোর কোনোটির সাথেই কোনোটির মিল নেই। অথচ প্রতিটি সিনেমাই দর্শকদের মাঝে দারুণ সাড়া ফেলেছে।
খবরের সবচেয়ে বড় চমক হলো ৯৪ বছর বয়সী কিংবদন্তি পরিচালক সিঙ্গেথাম শ্রীনিবাস রাওয়ের সিনেমা ‘সিংগীতম’। ‘কাল্কি’র ব্লকবাস্টার পরিচালক নাগ অশ্বিন এই সিনেমাটি প্রযোজনা করেছেন। এই বয়সে এসেও এমন একটি অনবদ্য ফ্যান্টাসি মিউজিক্যাল সিনেমা বানিয়ে তিনি দর্শকদের হলমুখী করেছেন।
অ্যাকশন কুইন সামান্থা রুথ প্রভু তার নতুন সিনেমা ‘মা ইন্টি বাঙ্গারাম’ দিয়ে বক্স অফিসে ঝড় তুলেছেন। সাধারণত ফ্যামিলি ড্রামা সিনেমায় অ্যাকশন থাকে না, কিন্তু এই ছবিতে সামান্থা একই ফ্রেমে আবেগ ও অ্যাকশন দুটোই ফুটিয়ে তুলেছেন। কোনো বড় ‘হাইপ’ ছাড়াই স্রেফ চমৎকার গল্পের জোরে সিনেমাটি এখন ১০০ কোটি রুপির ক্লাবের দিকে এগোচ্ছে।
সাউথ সুপারস্টার মহেশ বাবু যেখানে ভারতের সবচেয়ে বড় সিনেমা এসএস রাজামৌলির ‘বারাণসী’ নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে তিনি নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যাক করছেন সত্যদেবের ‘রাও বাহাদুর’ নামের একটি সাইকোলজিক্যাল ফ্যান্টাসি ছবিকে। মহেশ বাবুর মতো মেগাস্টার যখন এমন একটি ভিন্নধর্মী এক্সপেরিমেন্টের পাশে দাঁড়ান, তখন বুঝতেই হবে তেলুগু সিনেমার দিন বদলাচ্ছে।
বিষ্ণু মন্দিরের প্রাচীন রহস্য ও পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে তৈরি অ্যাডভেঞ্চার ছবি ‘নাগাবন্ধম’। সিনেমাটির বাজেট ১০০ কোটি রুপি হলেও এর হিরো বিরাট কর্ণ একদমই নতুন মুখ। অর্থাৎ, কোটি কোটি টাকা নায়কের পারিশ্রমিকের পেছনে ব্যয় না করে খরচ করা হয়েছে সিনেমার মেকিং, গ্রাফিকস ও নিখুঁত ভিজ্যুয়ালের পেছনে, যাতে গল্পটাই আসল হিরো হয়ে উঠতে পারে।
এই পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে প্যান-ইন্ডিয়া ও কমার্শিয়াল প্রজেক্টেও। নানির ‘দ্য প্যারাডাইজ’ বা বিজয় দেবরাকোন্ডার ‘রণবালী’র মতো বড় বাজেটের ছবিগুলোও এখন চেনা কমার্শিয়াল ছকের বাইরে গিয়ে তৈরি হচ্ছে। এমনকি রবি তেজা, যিনি সাম্প্রতিক কিছু দুর্বল চিত্রনাট্য বাছাইয়ের জন্য সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন, তিনিও ‘ইরোমুডি’ দিয়ে স্পষ্টতই ভিন্ন কিছু করছেন।
দুলকার সালমানের ‘আকাশমলো ওকা তারা’ এবং আনন্দ দেবরাকোন্ডার ‘তক্ষকুডু’র মতো সিনেমাগুলোও প্রমাণ করছে যে অভিনেতারা এখন নিরাপদ রাস্তার বদলে ইউনিক বা আনপ্রেডিক্টেবল গল্প বাছাইয়ের এই নতুন ধারার দিকেই ঝুঁকছেন।
জনপ্রিয় তেলুগু ডিরেক্টর নন্দিনী রেড্ডি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমাদের এখানে এখন সব ধরনের সিনেমা আসছে—মাস ফিল্ম, নিউ-এজ ফিল্ম এবং এক্সপেরিমেন্টাল ছবি। আমরা রাতারাতি মালয়ালম সিনেমার মতো সম্পূর্ণ আর্ট-হাউস হয়তো হয়ে যাচ্ছি না, কারণ আমরা বাণিজ্যিক সিনেমা খুব ভালো বানাতে পারি এবং ছোট শহরের দর্শকদের আমরা কখনো ভুলে যাইনি। তবে হ্যাঁ, দর্শকদের রুচি বদলেছে।’
তিনি আরও জানান, আগে ধারণা করা হতো নারীরা বা পরিবারগুলো শুধু বড় কোনো উৎসবের সময়ই সিনেমা হলে আসে, কিন্তু সামান্থার নতুন ছবি সেই ধারণাও ভেঙে দিয়েছে। ‘লিটল হার্টস’, ‘বালাগাম’, ‘কমিটি কুররোল্লু’র মতো ছোট বাজেটের সিনেমাগুলো চেনা সমীকরণ ছাড়াই কোটি কোটি রুপি আয় করে দেখাচ্ছে যে, দর্শকরা স্রেফ সঠিক গল্পের জন্য অপেক্ষা করছেন।
দর্শকরা এখন চেনা ছকের মারপিট বা কোটি কোটি টাকার সেট দেখার চেয়ে সিনেমার গল্পের নতুনত্ব ও ভিন্নতাকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। স্রেফ সবচেয়ে বড় হওয়ার চেয়ে সবার চেয়ে আলাদা হওয়াই এখন তেলুগু সিনেমার নতুন রূপের আসল আকর্ষণ।





