আকাশি ভাগ্যনিয়ন্তা
মেসির সামনে সুইস দুর্গ

ফুটবলারদের ক্যারিয়ারে ত্রিশ পেরোলেই সাধারণত বিদায়ের রাগিণী বেজে ওঠে। গ্যালারির হাততালি তখন আর নতুন ইতিহাসের জন্য নয়, হয়ে ওঠে স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা। কিন্তু লিওনেল মেসি এ প্রথা ভেঙে দেওয়া এক জাদুকর। সময় তাকে বুড়ো করতে পারেনি, বরং এই প্রবীণ জাদুকরকেই সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র বানিয়েছে বিশ্বকাপ। টুর্নামেন্টের সব রঙ, আলো, নাটকীয়তা এসে জমা হয়েছে তার বিখ্যাত বাঁ পায়ে।
লিওনেল স্কালোনিও এ অমূল্য ট্রাম্পকার্ড নিয়ে নতুন নতুন নাটকের শো করে চলেছেন ট্রাম্পের দেশে। এসব দেখে কেউ মোহিত, কেউ বিস্মিত... এমনও হয়! মিসরের বিপক্ষে আগের ম্যাচে শ্বাসরুদ্ধকর থ্রিলারের পর কাল আর্জেন্টিনার সামনে সুইজারল্যান্ড। এটা পেরোলেই সেমিফাইনাল অর্থাৎ বিশ্বকাপ ফাইনাল থেকে দুটি জয় দূরে দাঁড়িয়ে তিনি। যেন এক মহাকাব্যের শেষের কয়েকটি পৃষ্ঠা বাকি। তিনি কীভাবে শেষ করবেন, তার অপেক্ষায় কোটি কোটি মানুষ।
মিসরের বিপক্ষে ৭৯ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা স্কালোনির জন্য এক বড় ধাক্কা ছিল। দেখা গেছে, রক্ষণে সমস্যা আর সুযোগ কাজে লাগাতে না পারার ব্যর্থতা। এ ম্যাচে মোলিনা ও আলভারেস নিজেদের সেরা ছন্দে ছিলেন না। বদলি নেমে মাঠে মন্তিয়েল ও লাউতারো মার্তিনেসের প্রভাব চোখে পড়েছে। তাই দলে দুটি পরিবর্তন আসতে পারে বলে অনেকের ধারণা। ডানে মোলিনা নাকি মন্তিয়েল এবং আক্রমণে আলভারেস নাকি লাউতারো মার্তিনেস খেলবেন? স্কালোনি সাধারণত টানা দুই ম্যাচে একই একাদশ খেলান না। আবার পরিবর্তন হলেও দুটির বেশি হবে না।
আর্জেন্টিনার সামনে সুইজারল্যান্ড সহজ প্রতিপক্ষ হলেও তারা প্রথমবারের মতো সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখছে। সর্বশেষ ১৯৫৪ সালে নিজেদের মাটিতে সুইসরা কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল। কাতারের সঙ্গে ড্র করে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করলেও এরপর ৪-১ গোলে বসনিয়া-হার্জেগোভিনাকে এবং ২-১ গোলে সহ-আয়োজক কানাডাকে হারিয়ে হয় গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। নকআউটে আলজেরিয়াকে ২-০ গোলে ও কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে সুইজারল্যান্ড এখন সেমিফাইনালে ওঠার মঞ্চে।
মুরাত ইয়াকিনের সুইজারল্যান্ড যেন এক সুদৃঢ় দুর্গ। তাদের ফুটবল সৌন্দর্য আক্রমণের ঝলকে নয়, রক্ষণের শৃঙ্খলায়। বাছাই পর্ব থেকে বিশ্বকাপের মূল আসরে কোনো ম্যাচ তারা আগে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়েনি। সুতরাং বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষেও ইয়াকিনের শিষ্যরা নিশ্চয়ই ওই অভেদ্য প্রাচীর আরও উঁচু করে তুলতে চাইবেন। পৃথিবীর সবচেয়ে মজবুত দুর্গও ভাঙে। সুইজারল্যান্ডের এই রক্ষণ দুর্গও অভেদ্য থাকতে পারে না। আর্জেন্টিনার সঙ্গে আগের সাতবার মুখোমুখিতে একবারও জিততে পারেনি সুইজারল্যান্ড।
আগের ম্যাচে মিসরও ভেবেছিল, ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে তারা ইতিহাসের দুয়ার খুলে ফেলেছে। তারা ভুলে গিয়েছিল, মাঠের এক কোণে তখনো দাঁড়িয়ে ফুটবল দেবতার সেরা সৃষ্টি লিওনেল মেসি। তার হাতেই থাকে ম্যাচের চাবিকাঠি। তিনি বল পায়ে নিলে ম্যাচের চিত্রনাট্য লেখা হয় নতুন করে। সবুজ ক্যানভাসে আর্জেন্টিনার ভাগ্য লিখতে লিখতেই ৮ গোল নিয়ে তিনি এখন যৌথভাবে গোলদাতার শীর্ষে।
সুইজারল্যান্ড এখনো সেই জাদুকরের মুখোমুখি হয়নি। তা ছাড়া মাঠের জাদুকরীর আগাম ঘোষণাও থাকে না। কখনো একটি নিখুঁত পাস, কখনো চোখধাঁধানো ড্রিবলেই ইয়াকিনের রক্ষণ দুর্গে ফাটল ধরতে পারে। আসলে কিছু ফুটবলার ম্যাচ খেলেন আর কিছু লেখেন ম্যাচের ভাগ্য। লিওনেল মেসি দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়েন। তার বাঁ পায়ের স্পর্শেই হিসাব বদলাচ্ছে, ভাগ্য বদলাচ্ছে আলবিসেলেস্তেদের।




