সাফের স্বপ্নে ডুলির ধাক্কা

মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশের চেনা ফুটবল মুখ থুবড়ে পড়েছে অজানার অন্ধকারে। হ্যাভিয়ের কাবরেরার দলে অন্তত শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার এক মরিয়া চেষ্টা থাকত, কিন্তু থমাস ডুলির দলের লড়াইয়ে ছিল না সেই ন্যূনতম স্ফুলিঙ্গটুকুও। কী অদ্ভুত, দিশাহীন এক ফুটবলের ক্যানভাস আঁকলেন নতুন জার্মান-আমেরিকান কোচ!
সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের স্বপ্নের বেলুন ফুলিয়ে আসিয়ান কাপে আস্ত দলকেই ডুবিয়ে দিয়ে এলেন এই কোচ। পরপর তিন ম্যাচে হার; হারের মাঝেও যে একটা বীরোচিত লড়াইয়ের আগুন থাকে, ডুলির এই দিগভ্রান্ত বাংলাদেশ দলে তার লেশমাত্র ছিল না। ইন্দোনেশিয়ার ৯ গোলের সেই তাণ্ডবে বাংলাদেশ ফুটবল লজ্জার তলানিতে গিয়ে ঠেকলে কোচের সেই তথাকথিত মহতী দর্শনের আর কী-ই বা অবশিষ্ট থাকে? যিনি দলের বিশ্বাস ভেঙে খান খান করে দিয়েছেন, তিনিই সাফের স্বপ্ন দেখাবেন! এ যেন বালুর বাঁধ দিয়ে সমুদ্রের ঢেউ আটকানোর স্পর্ধা!
ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলের ভরাডুবির পর এই দলকে নিয়ে সাফের স্বপ্ন দেখা এক অলীক কল্পনা। আধুনিক ফুটবলের এই তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে প্রতিপক্ষের জালে পাঁচ পাঁচটি গোল করা চাট্টিখানি কথা নয়। দুই গোল করার পরই তার ভয়ংকর মুভমেন্ট বন্ধ করার কৌশল থাকে। অথচ বাংলাদেশের ভঙ্গুর রক্ষণভাগকে নিয়ে ছেলেখেলা করে মিচেল বেকার পাঁচ গোলের কীর্তি গড়েন হেসেখেলে।
প্রতিপক্ষের খেলার ধরন, কৌশল নিয়ে আদৌ কোনো বিশ্লেষণ ছিল, নাকি নিজের রক্ষণ সাজাতে থমাস ডুলির কোনো রূপরেখা ছিল, তা নিয়ে বেশ ধোঁয়াশা আছে। ম্যাচের প্রথমার্ধে পুরো দল নিচে নেমে রক্ষণের চেষ্টা করলেও ডিফেন্সিভ ব্লকগুলো ঠিকমতো হয়নি। তাহলে ক্লোজডোর ট্রেনিংয়ে কোচ কী শেখালেন এতদিন! ইন্দোনেশিয়ার শক্তির জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করার ন্যূনতম চেষ্টা কিংবা নিজের দলকে সুসংগঠিত রাখার কোনো ছাপই দেখা যায়নি ডুলির কৌশলে।
ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে মনে হচ্ছিল বাংলাদেশ বোধহয় এই গোলের রাশ টেনে ধরতে পেরেছে। কিন্তু হায়, তা ছিল স্রেফ ঝড়ের আগের নীরবতা! ৯০ মিনিট ছুঁয়ে যোগ করা সময়ের সেই ৭ মিনিটে খেয়েছে আরও তিন গোল। টুর্নামেন্টের ফাইনালে ওঠার জন্য ইন্দোনেশিয়ার যে বড় ব্যবধানের জয় ও গোলের হিসাব দরকার ছিল, তা হাসিমুখে মিটিয়ে দিলেন জিদান-জামালরা। আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে স্বাগতিকদের জন্য এমন ‘উপকারী’ প্রতিপক্ষ পাওয়া সত্যিই বিরল!
অথচ বাংলাদেশ ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৯ বংশোদ্ভূত ফুটবলার নিয়ে এবার দল গিয়েছিল আসিয়ান কাপ খেলতে। হামজা চৌধুরীর পর জায়ান, জিদান, শুকি, ফারহানসহ কত রোমাঞ্চকর নাম! তাদের ভক্তরা ভার্চুয়াল ময়দানে প্রতিপক্ষকে খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিচ্ছেন রোজ। প্রিয় কোনো তারকাকে একাদশে না দেখলে আবার ফুঁসে উঠছেন। কিন্তু সবুজ মাঠে সেই অলীক মোহ ভেঙে চুরমার, কোনো জাদুতেই মিলছে না কাঙ্ক্ষিত আলোর দেখা।
এই ব্যর্থতার দায় কতটা খেলোয়াড়দের আর কতটা তাদের কোচের? থমাস ডুলির কোচিং বুক থেকে এখনো এমন কোনো জাদুকরী মন্ত্র বের হয়নি, যা দেখে সাফের মঞ্চে এই কারিগরের ওপর ভরসা রাখা যায়। দামি সব যন্ত্র হাতে নিয়েও সুরকার সুর বাঁধতে না পারলে ভুলটা বাদ্যযন্ত্রের নাকি বাদকের, এই হিসাব কে মেলাবে।



