আকাশি জাদুর দিন ফুরোল

পৃথিবী আর দেখবে না তার পায়ের জাদুকরী ফুটবল। ৩৯ বছর বয়সেও যিনি আকাশি-সাদা জার্সিতে বিশ্বকাপ মাতিয়েছেন, সেই জাদুকরকে আর দেখা যাবে না। যার পায়ে বল গেলে কোটি কোটি মানুষের চোখে জ্বলে উঠত অসম্ভব সম্ভবের স্বপ্ন— সবকিছুকে মুহূর্তেই থামিয়ে দিলেন লিওনেল মেসি। ফুটবল জাদুকরকে আর দেখা যাবে না আর্জেন্টিনার জার্সিতে।
তার খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে পৃথিবীর অনেক মানুষের। কিন্তু তার হাতে বিশ্বকাপের অপরূপ শোভা দেখার সৌভাগ্য সবার হয়নি। লুসাইল স্টেডিয়ামে বসে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিতে তার বিখ্যাত চুমুর স্মৃতি যেন ভাসছে চোখের সামনে। মহাতারকার দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ভোলার নয়। সেই রাতের কথা মনে পড়লে এখনো মনে হয়, সেটি কোনো ফুটবল ম্যাচ নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। এক অসমাপ্ত মহাকাব্যের পূর্ণতা পাওয়ার রাত।
কিন্তু সেই পূর্ণতার আগে ছিল দীর্ঘ এক অপেক্ষা ও হতাশা। ২০১৪ বিশ্বকাপের সেই ফাইনালের স্মৃতিও-বা ভুলি কী করে। ব্রাজিলের মারাকানায় জার্মানির বিপক্ষে ফাইনাল হারের পর মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা মেসির মুখে যে শূন্যতা দেখেছিলাম, তা যেন এক ফুটবলারের পরাজয়ের চেয়েও বেশি। গোল্ডেন বল জেতার পরও তার চোখে-মুখে হাহাকারের ছবি। হতাশা এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়েছিল তাকে, কোনো দিনও যেন হাতে নেওয়া হবে না ওই সোনালি ট্রফি। মনে হয়েছিল ফুটবল ঈশ্বরও সব দিয়ে এ অপূর্ণতাটুকু রেখেই তাকে বিদায় দেবেন! এরপর রাশিয়া বিশ্বকাপে সেই আশঙ্কা আরও বাড়ে, মেসির ক্যারিয়ার এক ফুটবল শিল্পীর অসমাপ্ত চিত্রকর্ম হয়েই থেকে যেতে পারে!
অথচ যার পায়ের জাদুতে মাঠ হয়ে উঠেছে নিখাদ বিনোদনের মঞ্চ, যার খেলা দেখে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ফুটবলকে নতুন করে ভালোবাসতে শিখেছে— তার নিয়তি কি সত্যিই এমন নিষ্ঠুর হতে পারে? আটটি ব্যালন ডি’অর যার শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দেয়, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা শিল্পী যিনি, তার প্রতিও যে ভীষণ অবিচার হয়। ২০২২ বিশ্বকাপে ফাইনাল দেখার রাতে বোঝা গেছে, ওই দীর্ঘ অপূর্ণতা ও হতাশা না থাকলে কিংবদন্তির গল্প তৈরি হয় না।
সেটি তৈরি হয়েছে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই মহাকাব্যিক ফাইনাল জয়ে। সেদিন স্টেডিয়ামের বাতাসেও যেন অন্য রকম কিছু ছিল। মেসি মাঠে নামার পর মনে হচ্ছিল, শুধু একটি দল নয়, তার সঙ্গে মাঠে নেমেছে কয়েক দশকের অপেক্ষা। একটি জাতির স্বপ্ন। কোটি মানুষের প্রার্থনা। আর একজন মানুষের অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস। ম্যাচ গড়াল, নাটক জমল, ইতিহাস বারবার তার মোড় বদলাল। আর শেষ পর্যন্ত সেই মুহূর্ত—আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।
লুসাইল স্টেডিয়ামে বসে দেখেছিলাম, মেসি বিশ্বকাপ ট্রফিতে চুমু খাচ্ছেন। আর পুরো স্টেডিয়াম অপরূপ হয়ে উঠল আতশবাজির ঝলকানিতে। সেই দৃশ্যকে ভাষায় বোঝানো কঠিন। কিছু অনুভূতি শব্দের চেয়েও বড়। কিছু মুহূর্ত জীবনের ক্যালেন্ডারে তারিখ হয়ে থাকে না, হয়ে থাকে হৃদয়ের স্থায়ী ঠিকানা। লুসাইলের সেই রাত ঠিক তেমনই।
কী অদ্ভুত জীবন! যে ফুটবলারকে দেখে আমরা গ্যালারিতে বসে স্বপ্ন দেখেছি, এখন থেকে সেই মানুষটি আমাদের মতোই গ্যালারির দর্শক। যে জার্সি একসময় তার শরীরের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল, সেটি এখন স্মৃতির অংশ হয়ে থাকবে।
আজ তার বিদায়ে কোটি কোটি ভক্তের মন খারাপ হবে। হয়তো কোনো একদিন পুরনো কোনো ভিডিওতে মেসিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে দৌড়াতে দেখে বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে যাবে। তখন মনে হবে— একটা সময় ছিল, যখন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ফুটবল অধ্যায়টা একজন লিখে গেছেন তার বাঁ পায়ে।







