অবশেষে গানারদের বসন্ত

আপনি তখন স্কুলে। সন্ধ্যাবেলার পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বসলেন ১৪ ইঞ্চি টিভির সামনে। হালকা ঝিরঝির করতে থাকা খেলার চ্যানেলে দেখলেন লাল-সাদা জার্সির শিরোপা উদযাপন। উদযাপনের কেন্দ্রে আছেন লাল টাই, কালো সুট পরা সাদা চুলের এক ভদ্রলোক। কোনো এক অজানা কারণে প্রেমে পড়ে গেলেন নর্থ লন্ডনের ক্লাবটির।
‘প্রেম করবেন, কষ্ট পাবেন না, তা কি হয়? প্রতি মৌসুমেই শিরোপার আশায় বুক বাঁধেন। কিন্তু ভালোবাসার সেই ক্লাবটি দিয়ে যায় শুধুই বেদনা। মৌসুমের পর মৌসুম যায়, শিরোপা আর আসে না।
স্কুল-কলেজের পাট চুকিয়ে প্রবেশ করলেন বিশ্ববিদ্যালয় যুগে। আর্সেনাল ততক্ষণে শিরোপা লড়াই থেকে অনেক দূরে। প্রতিপক্ষ মজা করে বলে, আর্সেনালের জায়গা সেই ৪ নম্বরেই!
একের পর এক অপ্রাপ্তি আপনার ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়। সুদূর লন্ডনে তখন ‘ওয়েঙ্গার আউট’ আন্দোলন চরমে। ‘আর্সেনাল মানেই আর্সেন ওয়েঙ্গার’, লাখো সমর্থকের সেই আবেগ তখন পরিণত হয়েছে তীব্র ক্ষোভে। চোখের জল, হতাশা, রাজ্যের স্মৃতি নিয়ে প্রিয় ক্লাবকে বিদায় জানালেন দলটির ইতিহাসের সফলতম কোচ, থামল ২২ বছরের পথচলা।
ঘরের ছেলে মিকেল আর্তেতা এলেন, নতুন আশায় বুক বাঁধল সমর্থকরা। এলো না সাফল্য। চাকরি, সংসারে ব্যস্ত আপনি খেলা দেখাও কমিয়ে দিলেন। নিজের অজান্তেই মাঝেমধ্যে একটু খোঁজ নেন, কেমন করছে প্রিয় ক্লাব?
হঠাৎ করেই অফিসে শুনলেন, এবার তো আর্সেনাল লিগ জিতেই যাবে! রাতে বাড়ি ফিরে আবার বসলেন টিভির সামনে। এবার আপনার সঙ্গে ছিল আপনার ছোট্ট সন্তানও। কিছু না বুঝলেও বাবার যে দল, সেও তাই। কিন্তু আর্সেনাল হলো রানার্সআপ। পরের দুই মৌসুমেও দুইয়েই আটকে গেল আর্তেতার দল। আবারও আশা ছেড়ে দিলেন। সবাই হাল ছাড়লে কি আর চলে? দলের ফুটবলাররা আর্তেতার বাণীতেই রাখলেন ভরসা।
মৌসুমের শেষভাগে যা হয়ে আসছে ২২ বছর ধরে, সে কি এত সহজে পিছু ছাড়বে? এপ্রিলে এলোমেলো সব। একের পর এক হোঁচট খেয়ে তখন দিশাহারা। সিটি তাদের সব ম্যাচ জিতলেই হবে চ্যাম্পিয়ন। সবাই তখন আরেকবার আশাভঙ্গের নিয়তিটা মেনেই নিয়েছে।
সিটির কাছে হারের পর রাইসের সেই কথাটিই সবার কানে বাজছিল, ‘ইটস নট ডান!’ নাটকের শেষটা তখনো বাকি। নাটকীয়ভাবে পয়েন্ট হারাল সিটি, আর্সেনালের স্বপ্ন পেল নতুন প্রাণ। শেষ ম্যাচের আগেই অপেক্ষা ফুরল। সিটির ড্রয়ের পরই নিশ্চিত হয় আর্সেনালের লিগ শিরোপা।
হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশে তখন শেষরাত। ২০০৪ সালের পর আবারও আপনার চোখে পানি। সন্তান নিয়ে সাতসকালে মেতে উঠলেন শিরোপা জয়ের আনন্দে।
এত উল্লাস, এত আনন্দ, এত উচ্ছ্বাস। নর্থ লন্ডনে আনন্দে মাতোয়ারা লাখো সমর্থকের ভিড়ে আপনার মতো অনেকেই হয়তো খুঁজেছে সেই ওয়েঙ্গারকেই।
স্কুল থেকে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরি, বিয়ে থেকে সন্তান; আর্সেনালকে আপনি ছেড়ে যাননি। আর্সেনালও আপনাকে ছাড়ল কই? ২২ বসন্তের অপেক্ষা শেষে উৎসবের আনন্দে নর্থ লন্ডন ও ঢাকা মিলে গেল এক বিন্দুতে।




