পাকিস্তানকে পেলেই হোয়াইট ওয়াশ

বাংলাদেশ ক্রিকেটের ‘বিষাদসিন্ধু’ মুলতান। নিজেদের ইতিহাসে প্রথম টেস্ট জয়ের দুয়ার থেকে যন্ত্রণা নিয়ে ফিরতে হয়েছিল খালেদ মাহমুদ সুজনের দলকে। ১ উইকেটে হারের পর সুজনের কান্না ছুঁয়ে যায় গোটা দেশকে। ২০০৩ সালের সেই শোক ভুলে বাংলাদেশ এখন টেস্ট ক্রিকেটের সমীহ জাগানিয়া দল। এতটাই যে, বাংলাদেশ বলে-কয়েই হারাচ্ছে পাকিস্তানকে।
নাজমুল হোসেন শান্তর দল সিলেটে পাঁচ দিনের রোমাঞ্চকর লড়াই শেষে আরও একবার হারাল পাকিস্তানকে। ৪৩৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান পঞ্চম দিনে অলআউট ৩৫৮ রানে। ৬ উইকেট তাইজুল ইসলামের। ম্যাচসেরা হয়েছেন লিটন দাস আর সিরিজসেরা মুশফিকুর রহিম।
৭৮ রানের জয়ে পাকিস্তানকে টানা দ্বিতীয় সিরিজে ২-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ করল বাংলাদেশ। পাকিস্তানের মতো ঐতিহ্যবাহী দলের বিপক্ষে এটি নতুন ইতিহাস। এর আগে কোনো দলই তাদের হোম অ্যান্ড অ্যাওয়েতে হোয়াইটওয়াশের লজ্জা দিতে পারেনি। অকল্পনীয় সেই সাফল্যই পেয়েছে নাজমুল হোসেনের দল।
এমন দাপুটে ক্রিকেটের জন্য বাংলাদেশকে প্রশংসায় ভাসালেন পাকিস্তানি কিংবদন্তি ওয়াসিম আকরাম, ‘পাকিস্তানের দ্বিতীয়বার হোয়াইটওয়াশ হওয়াটা সত্যিই ভীষণ হতাশার। তবে বিজয়ী দল পূর্ণ প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। কারণ, তারা খেলেছে পরিপূর্ণ ক্রিকেট। বাংলাদেশ এখন এই ফরম্যাটে বিশ্বের যেকোনো সেরা দলের সঙ্গে লড়াই করতে প্রস্তুত।’
২০০৩ সালে মুলতানে হারের পর বাংলাদেশ নিজেদের ইতিহাসে প্রথম টেস্ট জেতে ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। এরপর পাকিস্তানের বিপক্ষে যতবার মুখোমুখি হয়েছে, নাস্তানাবুদ হয়েছে প্রতিবার। ২০২৪ সালে রাওয়ালপিন্ডিতে শুরু ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙা। সেবার টানা দুই টেস্ট জিতে বাংলাদেশ জানান দেয়, মুলতান এখন অতীত। বছর দেড়েক পর এবার ঘরের মাঠের সিরিজে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিল পেস, স্পিন কিংবা ব্যাটিং— সবদিক দিয়েই পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। শুধু টেস্ট নয়, সর্বশেষ খেলা ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি সিরিজেও পাকিস্তানকে হারিয়েছে বাংলাদেশ।
মুলতান টেস্টে প্রথম ইনিংসে ৭২ রান করা হাবিবুল বাশার এখন বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচক। সেই টেস্টের স্মৃতি আর এবারের সাফল্য নিয়ে আগামীর সময়কে তিনি বলেছেন, ‘ওই টেস্টের (মুলতান ২০০৩) কথা কি ভোলা যায়। ওই ম্যাচটি জিতলে আমাদের ক্রিকেট অনেক এগিয়ে যেত। ওই ম্যাচ, সময় আলাদা। প্রথম টেস্ট জয়। আসলে যেকোনো টেস্ট জেতাই বিশেষ। আর এবারের সিরিজটা আলাদা। কারণ হলো, কেউ এখন আর আমাদের ট্যাগ দিতে পারবে না। বলবে না যে আমরা শুধু স্পিন উইকেট বানিয়েই ম্যাচ জেতার চেষ্টা করি। এর আগে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে যখন জিতেছিলাম, অনেকে এ কথা বলেছিল। এবার আরও একটা ব্যাপার ছিল যে আমরা জেতার জন্য খেলেছি। আমরা স্পোর্টিং উইকেট তৈরি করে খেলিয়েছি। পাকিস্তান সিলেটে শেষদিকে তো রান তাড়ার অবস্থায় গিয়েছিল। আমরা ওখান থেকে ম্যাচ জিতেছি। এটাও বড় স্টেটমেন্ট।’
মুলতান টেস্টের অধিনায়ক খালেদ মাহমুদ সুজনের কণ্ঠেও ঝরল তৃপ্তি, ‘এই সিরিজ জয়ে আমি সত্যিই গর্বিত। এটি আমাদের জন্য অন্যরকম আনন্দ এনে দিয়েছে। এত বছর আগের যে ক্ষত, সেখানে কিছুটা হলেও প্রলেপ দেবে এই জয়। আর ওই কষ্ট একটা আবেগের জায়গা, যারা আমরা ওই দলে ছিলাম। আমি চাইব, ছেলেরা এবার এমন কষ্ট করে যে ম্যাচ জিতেছে, সেভাবে যেন ওরা সাফল্য ধরে রাখে।’
সিলেট টেস্ট জিততে হলে বিশ্বরেকর্ড গড়তে হতো পাকিস্তানকে। ৪৩৭ রানের সেই দুর্গম পাহাড় পাড়ি দেওয়ার মতো দুঃসাহসী জুটিও দুটি হয়েছিল চতুর্থ দিন। লড়াই, পাল্টা লড়াইয়ে সেই জুটি ভেঙে ম্যাচে ফেরে বাংলাদেশ। বুধবার শেষ দিন জয়ের জন্য পাকিস্তানের দরকার ছিল ১২১ রান আর বাংলাদেশের ৩ উইকেট।
শান্তর দলের হতাশা বাড়িয়ে রিজওয়ান আর সাজিদ খান কাটিয়ে দেন প্রথম ঘণ্টা। তখন উদ্বেগ বাড়ছিল বেশ, পাল্লা দিয়ে শঙ্কাও। অষ্টম উইকেটে ৫৪ রানের জুটি হয়ে গিয়েছিল দুজনের। তখনই মেহেদী হাসান মিরাজের চোটে মাঠে এলেন ফিজিও। তার শুশ্রূষা চলল কিছুক্ষণ। তাতেই হয়তো মনোযোগে চিড় ধরল পাকিস্তানের। বিরতির পর খেলা শুরু হতেই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল পাকিস্তান।
৭ উইকেটে তাদের স্কোর ছিল ৩৫৮। সেই ৩৫৮ রানেই ১৩ বলের ব্যবধানে অলআউট পাকিস্তান! শুরুটা করেন তাইজুল ইসলাম। অফ স্টাম্পের বাইরে পিচ করা তার বল পা বাড়িয়ে খেলতে চেয়েছিলেন সাজিদ (২৮ রান), যা ব্যাটের কানা ছুঁয়ে জমা হয় প্রথম স্লিপে শান্তর হাতে। টেস্টে এটি ছিল ১৮তম বারের মতো তাইজুলের ৫ উইকেট নেওয়ার কীর্তি।
মুলতানে অপরাজিত ১৩৮ রানের ইনিংসে বাংলাদেশের জয় কেড়ে নিয়েছিলেন ইনজামাম-উল হক। সিলেটেও ৯৪ রানে অপরাজিত থেকে তেমন কিছুর স্বপ্ন দেখছিলেন রিজওয়ান। কিন্তু সাজিদ ফেরার পরের ওভারেই সেঞ্চুরি থেকে ৬ রান দূরে থাকতে আউট রিজওয়ান। শরিফুল ইসলামের অফ স্টাম্পের বাইরের বল জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাট চালিয়ে গালিতে মিরাজকে ক্যাচ দেন তিনি। ১৬৬ বলে ১০ বাউন্ডারিতে ৯৪ রানের ইনিংস খেলে মাঠ ছাড়ার সময়ই রিজওয়ান বুঝতে পেরেছিলেন ম্যাচের নিয়তি।
বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্তটা আসে বেলা ১১টা ২০ মিনিটে। তাইজুলকে ছক্কা মারতে গিয়ে খুররাম শাহজাদ বল তুলে দেন আকাশে। ওয়াইড লং-অনে ক্যাচের জন্য তৈরি ছিলেন তানজিদ হাসান তামিম। স্টাম্প মাইক্রোফোনে তখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল তাইজুলের চিৎকার, ‘এই তামিম, ক্যাচ! বলটা আছে (বাউন্ডারির ভেতর)।’ তামিম ক্যাচটা নিতেই নিশ্চিত হয়ে যায় পাকিস্তানকে টানা চার টেস্ট হারিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস গড়া। চাইলে তাই ফ্রেমবন্দি করে রাখা যায় সিলেট স্টেডিয়ামে রাখা ঘড়ির ১১-২০ মিনিট সময়টা!
ম্যাচ শেষে ট্রফি ছাড়াই বাংলাদেশি খেলোয়াড়রা ছবি তুললেন পিচের কাছে দাঁড়িয়ে। হয়তো এটা বোঝাতে, টেস্ট জিততে আর ঘূর্ণি নয়, স্পোর্টিং পিচ বানিয়েই প্রতিপক্ষকে নাকানিচুবানি খাওয়াতে পারেন তারা। ওয়াসিম আকরামও বলেছেন একই কথা, ‘বাংলাদেশ একসময় নিচু বাউন্সের ঘূর্ণি উইকেট বানাত। কিন্তু এখন তারা দুর্দান্ত টেস্ট উইকেট তৈরি করছে, যা তাদের উদীয়মান পেসারদের সাহায্য করছে। এই পেসাররাই গতির ঝড়ে পাকিস্তানকে বিধ্বস্ত করেছে।’
এই বাংলাদেশ আর শোকে কাতর হয় না। বরং পাল্টা আঘাত করতে তৈরি থাকে সবসময়। এজন্যই মুলতানের যন্ত্রণা ভুলে অমর মহাকাব্য রচিত হলো এবারের সিরিজে।




