ডারউইনে স্বাগতিক ছিল বাংলাদেশ!

সংগৃহীত ছবি
টেস্ট ম্যাচ শুরুর আগে দুই অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলনটা হয় বেশিরভাগ সময়ে স্টেডিয়ামের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে। ডারউইন টেস্ট শুরুর আগের দিন, প্যাট কামিন্স আর নাজমুল হোসেন শান্ত কথা বললেন খোলা রাস্তায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। যতটা না পরদিন থেকে শুরু হতে যাওয়া টেস্ট ম্যাচকে ঘিরে প্রশ্ন, তার চেয়েও বেশি অস্ট্রেলিয়ার আসন্ন ব্যস্ত সূচী নিয়ে। ডারউইন টেস্ট ক'দিনে শেষ হবে, এমন প্রশ্নও শুনলেন কামিন্স। কোন টেস্ট ম্যাচ শুরুর আগের দিনে চেনা প্রক্রিয়াগুলোর অচেনা রূপ যতটা অবাক করেছে অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ককে, বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের ততটা করেনি। কারণ গত কয়েক বছরে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটারদের চেয়ে তারাই তো ডারউইনে খেলেছেন বেশি! তারই ফল পেয়েছে হাতে-নাতে। সেখানে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাসের সেরা জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।
সময়টা ২০২৪ সালের জুলাই, বাতাসে তখন বারুদের গন্ধ কেবল ছড়াতে শুরু করেছে। এরকম সময়েই তৎকালীন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন বোর্ড সভা শেষে জানালেন, অন্যতম ব্যয়বহুল সফরে অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছে বাংলাদেশের একটি দল। দেশটির নর্দার্ন টেরিটরি রাজ্যের ক্রিকেট সংস্থার আমন্ত্রণে হাই পারফরম্যান্স দল যাবে অস্ট্রেলিয়াতে।এখানে জানিয়ে রাখা ভাল, অস্ট্রেলিয়ার নর্দার্ন টেরিটরি অর্থাৎ দেশের মানচিত্রের উপরের দিকের যে অংশটি, সেই অঞ্চলে ক্রিকেটের প্রসার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের চাইতে কম। ২০০৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফরে এখানে টেস্ট খেলা হয়েছিল,পরের বছরও খেলেছিল অস্ট্রেলিয়া।
এরপর এবারের ডারউইন টেস্ট, মাঝে ২২ বছরের শূন্যতা। এই রাজ্যের কোন ক্রিকেট দল অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া প্রথম শ্রেণীর প্রতিযোগিতা শেফিল্ড শিল্ড, একদিনের ক্রিকেটে মার্শ ওয়ানডে কাপ বা টি-টোয়েন্টি লিগ বিগব্যাশেও খেলে না। সেসব প্রতিযোগিতাও হয় না সেখানে। ২০০১ সাল থেকে এখানে নিয়মিত আয়োজন করা হয় ইমপারজা কাপ। এতে খেলে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী ক্রিকেটারদের দলগুলো।
সেই ডারউইনে অস্ট্রেলিয়া টেস্ট খেলতে গেল, কিন্তু বাংলাদেশকে কেন ডাকল? উত্তর লুকিয়ে আছে অর্থনীতিতে। বছরের শুরুর দিকে, মার্চ-এপ্রিল-মে; মিলিয়ে প্রায় ৩ মাসের মত চলে আইপিএল, ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ। এই লিগে ডাক পান ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররা, তারা এই সময়টায় অন্য কোথাও টেস্ট খেলে না। তাই বাড়তি আয়ের সুযোগ মেলে। এখন বছর জুড়ে তিন সংস্করণের ব্যস্ত সূচী; ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টিতে অনামী আর কচিকাঁচাদের দিয়ে চালিয়ে নেওয়া গেলেও টেস্টের বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট নিয়ে বড় দলগুলো কোন ঝুঁকিই নেয় না। তাই এই সময়ে ডারউইনে খেলছে অস্ট্রেলিয়া।
আইপিএল এর কারণে সংকুচিত হয়েছে মৌসুম, বাংলাদেশের বিপক্ষে এই দুটো টেস্ট ২০২৭ থেকে এগিয়ে আনা হয়েছে ২০২৬ সালে। তখন টেস্টের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ইংল্যান্ডের সঙ্গে বিশেষ একটা টেস্ট খেলবে অস্ট্রেলিয়া। এখন তাদের প্রধান যে টেস্ট ভেন্যুগুলো; যেমন সিডনি, মেলবোর্নের আইকনিক মাঠগুলোতে এখন চলছে অস্ট্রেলিয়ান রুলস ফুটবলের ঘরোয়া মৌসুমের চূড়ান্ত পর্বের নাটকীয়তা। জনপ্রিয়তার পাল্লায় অস্ট্রেলিয়াতে রুলস ফুটবল, রাগবি'র পরে আসে ক্রিকেট। হুট করে এই দুই জনপ্রিয় খেলার পুরো মৌসুমের সূচীর মাঝে সিডনি বা মেলবোর্নের স্টেডিয়ামে টেস্ট আয়োজন সম্ভব নয়, অর্থনৈতিক ভাবেও অলাভজনক। তাই ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া ভেন্যু হিসেবে বেছে নিয়েছে ডারউইনকে, যে ভেন্যুতে গত দুই বছর প্রায় মাসখানেক করে থেকে খেলে গেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। আর কামিন্স মনেই করতে পারেন না আদৌ এখানে তিনি খেলেছেন কি না। আবছা ভাবে বললেন 'হয়তো অস্ট্রেলিয়ার 'এ' দলের হয়ে খেলেছি, একবার একটা প্রস্তুতি ক্যাম্পে এসেছিলাম।'
বছর দুয়েক আগে, নির্বাচক পদে থাকা আব্দুর রাজ্জাক এইচপি দলকে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর প্রসঙ্গে বলেছিলেন, 'লঙ্গার ভার্সন হবে অস্ট্রেলিয়ার কন্ডিশনে, এটা আমাদের জন্য খুব বড় একটা সুযোগ। অস্ট্রেলিয়ায় যেহেতু আমরা অনেক বছর টেস্ট খেলিনি, এটা আমাদের খেলোয়াড়দের জন্যও ভালো হবে। ওদের কন্ডিশনে ভালো খেলতে পারলে অন্য কন্ডিশনেও ভালো করা সহজ হবে।' মাঝে রাজ্জাক বোর্ড পরিচালক হয়েছিলেন, নির্বাচকের চাকরি খুইয়েছিলেন। এখন আবার তিনি হয়েছেন সেই এইচপি দলেরই স্পিন বোলিং কোচ। তবে ওই সময়ে অস্ট্রেলিয়াতে বাংলাদেশের কিছু ক্রিকেটারদের খেলতে পাঠানোটা নিঃসন্দেহে ভাল উদ্যোগ। তখন এইচপি দলের হয়ে অস্ট্রেলিয়া সফরে এসেছিলেন তানজিদ হাসান তামিম, যদিও তখন তিনি লাল বলের পরিকল্পনায় ছিলেন না। টপ এন্ড টি-২০ টুর্নামেন্টে ৮টা ম্যাচে ১৩৪ রান করেছিলেন তামিম। গত বছর বাংলাদেশ 'এ' দলের হয়ে ডারউইনে খেলতে খেলেছিলেন হাসান মাহমুদ, যদিও সাউথ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই চারদিনের ম্যাচে খুব বাজে ভাবেই হেরেছিল বাংলাদেশের দলটা।
অস্ট্রেলিয়া দলে ডারউইন থেকে উঠে আসা জেক উইদেরাল্ড, যিনি ২৩ বছর আগে এই মাঠের সবশেষ টেস্টে ছিলেন একজন ক্ষুদে দর্শক। এতটুকুই সংযোগ এই মাঠের সঙ্গে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা গত ২ বছর ধরেই ডারউইনে যাচ্ছেন, কেউ কেউ আগেও খেলেছেন। দলের কোচিং স্টাফের সদস্যদের কেউ কেউ ওখানে গিয়েছিলেন আগে। এই সংযোগ, এই তথ্যগুলোই বাংলাদেশকে এগিয়ে দিয়েছে প্রস্তুতির জায়গায়। যার কিছুটা পরিকল্পিত, কিছুটা কাকতালীয়। এই ছোট ছোট ব্যপারগুলোই বাংলাদেশকে ভাল খেলার প্রেরণা জুগিয়েছে। বলতে পারেন, শান্তরাই স্বাগতিক সুবিধা উপভোগ করেছে ডারউইনে!






