জিম্বাবুয়ে ধাক্কার পর বাংলাদেশের মহাউত্থান

একটু পেছনে ফিরি। জুনের শেষদিকে এই বাংলাদেশই জিম্বাবুয়েতে গিয়ে টেস্ট হেরেছে। চোখ কপালে সবার! পাকিস্তানকে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়েতে হোয়াইট ওয়াশ করা, দেশের মাঠে নিউজিল্যান্ডকে হারানো বাংলাদেশ জিম্বাবুয়েতে গিয়ে খাবি খাবে, সেটা কেউ মানতেই পারছিল না। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয়ে যায় সমালোচনা— ‘এরাই নাকি মাস দুয়েকের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলবে!’ ওই বিদ্রুপের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ায় প্রস্তুতি ম্যাচে বাংলাদেশ ৫৪ রানে অলআউট হলে সমালোচনার ঝড় বইয়ে যায়।
অথচ সেই দলটিই পাল্টে দিল সব ভোজভাজির মতো। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শীর্ষ দল অস্ট্রেলিয়াকে চার দিনে টেস্টে হারিয়েছে তাদের মাটিতে। তা-ও ২৩ বছর পর খেলতে গিয়ে। ইতিহাস গড়ে গৌরবের মুকুট সবার মাথায়। জিম্বাবুয়ের কাছে হারের পরের ঠাট্টা-টিপ্পনী উড়ে গেল মুহূর্তেই। হান্নান সরকার বলেই দিলেন, ‘ওই হারটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট।’
ঘরের মাঠে টানা চার টেস্ট জয়। আগের ১০ টেস্টে মাত্র তিনটি হার নিয়ে জিম্বাবুয়েতে যায় বাংলাদেশ। সাদা পোশাকে এমন সফল দলের জন্য আর যাই হোক জিম্বাবুয়ের কাছে টেস্ট হার কল্পনা করেনি কেউ। কিন্তু সেই কল্পনাই সত্যি হয়ে দেখা দিল। শুধু হারই নয়, একেবারে ইনিংস হার হজম করে আসে বাংলাদেশ।
টেস্টে এমন উত্থানের পর ওই পতনের কারণটা কী? জানতে চাইলে আগামীর সময়কে একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার হান্নান সরকার, ‘খেয়াল করে দেখবেন ওই ম্যাচে আমাদের সেরা একাদশের চারজন খেলেনি। তাসকিন, নাহিদ রানা, মিরাজ ও লিটন; এটা কিন্তু বড় একটা ফ্যাক্টর। অনেক দিন ধরে একটা কম্বিনেশন নিয়ে খেলার পর হঠাৎ পরিবর্তন আনলে একটু ব্যতিক্রম হয়। সেই রকম কিছু হবে হয়তো।’
তবুও শেষটায় সাবেক এই ওপেনার ওই হারকে দেখছেন এভাবে, ‘ওই হারটা একটু অস্বাভাবিক। আমি বলব এটা অ্যাক্সিডেন্ট। ক্রিকেটে মাঝে মাঝে এমন হতে পারে।’
সাবেক তারকা ক্রিকেটার আব্দুর রাজ্জাকের চোখে জিম্বাবুয়ের হারটি ছিল স্বাভাবিক। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকায় ইমার্জিং দলের এই বোলিং কোচ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘জিম্বাবুয়ে নিজেদের মাটিতে কখনোই খারাপ খেলে না। এখন ওদের আগের সময়টা নেই। পাকিস্তান-দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়েছিল ঘরের মাঠে। ভারতের সঙ্গেও জিতেছিল। সবশেষ সিরিজে ভারতের সঙ্গে লড়াই করেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে টেস্টে ওরা ভালো খেলে জিতেছে, এই কৃতিত্ব ওদের দিতে হবে।’
অবশ্যই জয়ের কৃতিত্ব জিম্বাবুয়ে পাবে। কিন্তু ওই টেস্টে বাংলাদেশ যে হোঁচট খেতে পারে তা চিন্তাতেই ছিল না প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের। ওই হারের পর তিনি বলেছিলেন, ‘দল খুব ভালো ছন্দে ছিল। টেস্টে সেরা পেসাররা খেলতে পারেনি। তবুও এত খারাপ হওয়ার কথা ছিল না। আমার কাছে ভুতুড়ে মনে হয়েছে। আমরা জিম্বাবুয়ের সঙ্গে সব সিরিজ জেতার মতো দল।’
হাবিবুলের কথাতেই স্পষ্ট, এই দলের প্রতি প্রত্যাশা। কিন্তু জিম্বাবুয়ের কাছে হোঁচট খাওয়ার পর যেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খুব বেশি প্রত্যাশা করেননি হাবিবুল। দল ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়া থেকে ‘সম্মান’ নিয়ে ফিরতে পারলেই তিনি খুশি।
কারণটা খুব পরিষ্কার— বাংলাদেশের পেস আক্রমণের মূল শক্তিই তখন অনুপস্থিত। সেরা পেসার নাহিদ রানা ছিলেন না, ছিলেন না শরিফুল ইসলামও। স্বপ্ন দেখার মানুষগুলো না থাকলে বাংলাদেশ নিয়ে প্রত্যাশা করারও সুযোগ থাকে না।
অথচ সেই দলটিই আবার চমকে দিল। তিন-চারজনের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সও আছে, তার চেয়েও বড় কথা পুরো চার দিন মাঠে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে জিতেছে বাংলাদেশে। ডারউইন টেস্টের প্রথম দিন হাসান মাহমুদের বিধ্বংসী বোলিং দেখে হাবিবুল বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ কেমন খেলতে পারে, তার একটা বার্তা দেওয়া হয়েছে।’ সেটি আর এক দিনের বার্তা হয়ে থাকেনি। টানা চার দিন একই মানসিকতা, একই রকমের পারফরম্যান্স দিয়ে খেলেছে বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকেই চাপে রেখে ইতিহাস গড়ে ম্যাচ জিতে নিয়েছে।
এই জয়টির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই— বাংলাদেশের ভালো করার দায়িত্ব এবার একজনের কাঁধে ছিল না। পুরো দল হয়েই খেলেছে দুর্দান্ত ক্রিকেট।
আগে প্রায়ই দেখা গেছে, দলের একজন খেলোয়াড় অসাধারণ কিছু করলে পুরো দল তাতে ভর করে এগিয়েছে। এবার যেন ছবিটা বদলে গেছে। একজন ভালো করছেন, তাকে দেখে আরেকজনের ভালো করার তাড়না তৈরি হচ্ছে। বোলিংয়ে হাসান মাহমুদ পথ দেখিয়েছেন। ব্যাট হাতে তানজিদ তামিম সেঞ্চুরি করেছেন। তরুণ এই ওপেনার দেখিয়েছেন ভয়ডরহীন ক্রিকেটের নতুন এক চেহারা। নাজমুল হোসেন শান্ত নিজের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুলে দলের প্রয়োজনের সময় নিজেকে মেলে ধরেছেন। এরপর দ্বিতীয় ইনিংসে সামনে এলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। তার বুদ্ধিদীপ্ত বোলিংয়ে আবারও হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং। অর্থাৎ একেক সময় একেক জন দাঁড়িয়ে গেছেন। কাঁধে তুলে নিয়েছেন দায়িত্ব।
হঠাৎ কোনো একটি দিন নিজেদের করে নেওয়াও সম্ভব। কিন্তু চার দিন ধরে একই রকম স্পিরিটেড পারফরম্যান্স দিয়ে টেস্ট জয়ের কীর্তিতে আছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের চরিত্র বদলের গল্প। এই দলে ম্যাচ উইনারের সংখ্যা বেড়েছে। সাহস বেড়েছে। বড় দলের বিপক্ষেও তারা গুটিয়ে থাকে না। বলতে পারেন, বাংলাদেশই এখন বড় দল হয়ে ওঠার সরণিতে ঢুকে পড়েছে।
তাহলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেই হার? এটি শুধুই পা হড়কানো। পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কাকে হারানোর পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চার দিন দাপুটে ক্রিকেট খেলা বাংলাদেশ দল নিয়ে আর কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়।






