রপ্তানি খাতের ‘ব্যাঙাচি’ কাঠামো বদলানো সময়ের দাবি

একমুখী শিল্পায়নের বিপদ নিয়ে বেশ অনেক দিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন অর্থনীতিবিদরা। শুধু পোশাকশিল্পের উপর ভর করে যে আমাদের চলবে না, সেটা আমরা এখন টের পাচ্ছি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই হয়তো গুরুতর সংকটে পড়বে পুরো অর্থব্যবস্থা
বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানি খাতের কাঠামোকে ‘ব্যাঙাচি’র সঙ্গে তুলনা করা যায়। অর্থাৎ, আমাদের রপ্তানি খাতের আছে একটি অতিশয় বড় মাথা (তৈরি পোশাক) এবং একটি সরু ও লম্বা লেজ (বাকি সব পণ্য)। দেশের স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আমরা রপ্তানি বাণিজ্যে যে বৈচিত্র্য বা বহুমুখীকরণের প্রত্যাশা করেছিলাম, তা বাস্তবায়নে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। আমাদের রপ্তানি পণ্য, বাজার এবং বিনিয়োগ— এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মেরুদণ্ড এখনো একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ। রপ্তানি খাতকে একটি টেকসই এবং পূর্ণাঙ্গ ‘ব্যাঙের’ রূপ দিতে হলে, যেখানে পেট বা উদরটি হবে বড়, মাথাটি হবে সুষম এবং লেজটি হবে খাটো, সেই কাঠামোগত রূপান্তর আমাদের জন্য এখন সময়ের দাবি।
রপ্তানির ‘ব্যাঙাচি’ কাঠামো : বাস্তব চিত্র ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলত একটিমাত্র খাত— তৈরি পোশাকশিল্পকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। এ খাতের অর্জন এবং অবদান নিঃসন্দেহে অতুলনীয়। গত কয়েক দশকে এই খাতটি রপ্তানির বাজার সম্প্রসারণ, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগ আকর্ষণ, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং নারীর ক্ষমতায়নের মতো প্রতিটি সূচকে অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু একমুখী এই অবদানের কারণে আমরা বহু খাতের বা সামগ্রিক বহুমুখীকরণের যে স্বপ্ন দেখি, সেখানে খুব বেশি এগোতে পারিনি।
বর্তমানে আমাদের রপ্তানিপণ্যের বাস্কেটে তৈরি পোশাকের অবদান ৮৫ শতাংশের বেশি। তবে আশার কথা হলো, তৈরি পোশাকের অভ্যন্তরে আমরা কিছুটা ‘অন্তঃবহুমুখীকরণ’ অর্জন করেছি। আগে যেখানে একটি মাত্র পণ্য রপ্তানির সিংহভাগ দখল করে রাখত, এখন সেখানে পাঁচ থেকে সাতটি ভিন্ন ধরনের পোশাকপণ্য রপ্তানি হচ্ছে। তবু দিনশেষে এটি মূলত পোশাক খাতেরই একটি অংশ। এর বাইরে কৃষিভিত্তিক পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, পাট ও পাটের সুতা, হালকা শিল্প পণ্য, প্লাস্টিক, সিরামিক এবং কেমিক্যাল প্রোডাক্টসসহ কিছু ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য রপ্তানি হয়। কিন্তু এই পণ্যগুলোর সম্মিলিত শেয়ার মোট রপ্তানির মাত্র ১৫ শতাংশ। সুতরাং আমাদের রপ্তানি খাত এখনো পোশাকের ওপর লতিয়ে থাকা একটি দীর্ঘ লেজের মতোই রয়ে গেছে।
শুধু পণ্য নয়, গন্তব্যও জরুরি
রপ্তানিপণ্যের বাজারের দিকে তাকালে দেখতে পাই, আমাদের মোট রপ্তানির ৬০ শতাংশ বাজার দখল করে আছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। বাকি ২০ শতাংশের মতো যায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে। এর বাইরে কানাডার মতো কিছু দেশ থাকলেও, সামগ্রিকভাবে আমাদের বাজার অত্যন্ত সীমিত।
বিশ্ববাজারে আমাদের অবস্থান শক্ত করতে হলে শুধু পণ্য নয়, রপ্তানি বাজারেও ব্যাপক বৈচিত্র্য আনা জরুরি। বাংলাদেশ বর্তমানে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) হিসেবে বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা ভোগ করে আসছে। কিন্তু আমরা এখন গ্র্যাজুয়েশনের চূড়ান্ত দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই বিশেষ শুল্ক সুবিধাগুলো আমরা আর পাব না। যখন উন্নত দেশগুলোর বাজারে আমাদের শুল্ক দিয়ে প্রবেশ করতে হবে, তখন আমাদের পণ্যগুলোকে চরম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। সেই কঠিন সময়ে টিকে থাকতে হলে এখন থেকেই আমাদের কৌশল পরিবর্তন করতে হবে।
খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিশেষ শুল্ক সুবিধাগুলো আমরা আর পাব না। তখন আমাদের পণ্যগুলোকে চরম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। সেই কঠিন সময়ে টিকে থাকতে হলে এখন থেকেই আমাদের কৌশল পরিবর্তন করতে হবে
এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ স্বাক্ষর করা। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত এবং প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম এরই মধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে ফেলেছে। এর ফলে আগামী দিনগুলোয় তারা আমাদের চেয়ে অনেক কম শুল্কে পণ্য রপ্তানি করতে পারবে। এই অসম প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের প্রচলিত বাজারগুলোর পাশাপাশি অপ্রচলিত বাজারগুলোয় নজর দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য, রাশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, সাউথ আফ্রিকা, চীন এবং কোরিয়ার মতো বিশাল বাজারগুলোয় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে দ্বিপক্ষীয় বা আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তির বিকল্প নেই।
সংকট ও নতুন সম্ভাবনার দ্বার
রপ্তানি বহুমুখীকরণের তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো বিনিয়োগের বহুমুখীকরণ। বাংলাদেশে রপ্তানি খাত মূলত দেশীয় উদ্যোক্তানির্ভর। অন্য অনেক দেশে, যেমন কম্বোডিয়া বা ভিয়েতনামে, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূল রপ্তানিকারক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে অভ্যন্তরীণ উদ্যোক্তার চেয়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বেশি। আমাদের ক্ষেত্রে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা থাকলেও তারা নতুন নতুন খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
এর বড় কারণ হলো, আমাদের রপ্তানি খাতের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ গুটিকয়েক বড় শিল্প গ্রুপের হাতে। তৈরি পোশাক ছাড়া অন্য কোনো রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির মতো পর্যাপ্ত মাঝারি বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে ওঠেনি। প্রতিটি খাতে ৫ থেকে ১০ জনের বেশি রপ্তানিকারক না থাকাটা সুস্থ প্রতিযোগিতার অভাব নির্দেশ করে। রপ্তানি বহুমুখীকরণের জন্য প্রতিটি খাতে নির্দিষ্টসংখ্যক উদ্যোক্তার উপস্থিতি প্রয়োজন, যাতে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পণ্যের মান ও দাম যাচাই করে অর্ডার দেওয়ার সুযোগ পান।
এ সংকট নিরসনে বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো ছাড়া বিকল্প নেই। অথচ আমাদের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে এক ধরনের অযৌক্তিক ভীতি কাজ করে— তারা মনে করেন এতে দেশি বাজার হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। আসলে বিদেশি বিনিয়োগ এলে উন্নত প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ ঘটবে, প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন লোকবল তৈরি হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের ফলে স্থানীয় উদ্যোক্তারা আরও দক্ষ হয়ে উঠবেন।
আমাদের ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যে পরিমাণ সাপ্লাই চেইনসংক্রান্ত প্রস্তুতির অভাব এবং প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হন, তা তাদের নিরুৎসাহিত করে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নীতি কাঠামোর বাস্তবায়নই পারে এ ক্ষেত্রে গতি আনতে।
উত্তরণের রূপরেখা: প্রোডাক্ট স্পেস ও নীতি কাঠামো
পণ্য বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে ‘প্রোডাক্ট স্পেস থিওরি’ (Product Space Theory) আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা হতে পারে। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, উদ্যোক্তারা সাধারণত তাদের বর্তমান দক্ষতার কাছাকাছি নতুন কোনো পণ্য উৎপাদন করতে বেশি সক্ষম হন। আমরা টি-শার্ট থেকে ব্লেজার বা স্পোর্টসওয়্যারে যেভাবে সফল হয়েছি, সেভাবেই আমাদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে সিনথেটিক, পলিয়েস্টার এবং ম্যানমেইড ফাইবার বা উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনের দিকে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। আমাদের উদ্যোক্তারা মূলত কম মূল্যের বা মধ্যম মানের পণ্য উৎপাদনে অভ্যস্ত। অথচ ভারত, ভিয়েতনাম বা তুরস্কের মতো দেশগুলো হাই-ভ্যালু বা উচ্চমূল্যের ডাইভার্সিফাইড পণ্য উৎপাদনে অনেক এগিয়ে আছে। সেই উচ্চমূল্যের মার্কেটে প্রবেশ করতে হলে আমাদের উৎপাদন দক্ষতা ও ব্র্যান্ড বায়ারদের চাহিদা অনুযায়ী মান নিশ্চিত করতে হবে।
প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের ক্ষেত্রেও আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছি। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা আম বা অন্যান্য পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে উৎপত্তিস্থল ও কীটনাশক ব্যবহারের ওপর কঠোর নজরদারি করেন। আমাদের কাঁচামাল ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। এ ছাড়া সেবা খাতের বিশাল বৈশ্বিক বাজারেও আমরা প্রায় অনুপস্থিত। তথ্যপ্রযুক্তি, নার্সিং, হসপিটালিটি এবং এয়ারলাইনস সেবার মতো খাতে বড় ব্যবসা করার প্রচুর সুযোগ থাকলেও আমরা তা কাজে লাগাতে পারিনি।
প্রয়োজন একসূত্রে গ্রথিত সমন্বিত উদ্যোগ
পরিশেষে, রপ্তানি বহুমুখীকরণ কোনো বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ দিয়ে সম্ভব নয়। আমাদের পণ্য বহুমুখীকরণ, বাজার বহুমুখীকরণ এবং বিনিয়োগ বহুমুখীকরণ— এই তিনটি বিষয়কে একসূত্রে বাঁধতে হবে। আমাদের এমন খাতভিত্তিক নীতিকাঠামো প্রয়োজন, যেখানে কে কোথায় কাজ করবেন, ফিসক্যাল ইনসেনটিভের কার্যকারিতা কেমন হবে এবং নতুন উদ্যোক্তারা কীভাবে সাপ্লাই চেইনের অন্তর্ভুক্ত হবেন— তা সুনির্দিষ্ট থাকবে।
আমাদের বর্তমান ব্যাঙাচিসদৃশ রপ্তানি কাঠামোটি পরিবর্তন করে একটি পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী রূপ দিতে হবে। লেজ কেটে ছোট করা এবং পেট বা উদরটিকে বড় করার মতো পরিকল্পিত ও কঠোর সংস্কারই পারে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক এবং বহুমুখী অবস্থানে নিয়ে যেতে। শুধু রপ্তানি দিবস পালন বা সাধারণ নীতিমালা নয়, বরং তৃণমূলপর্যায়ে সাপ্লাই চেইনভিত্তিক প্রস্তুতি এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আমাদের এই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। এখনই সময় আমাদের এই দীর্ঘ লেজধারী রপ্তানি কাঠামোর খোলনলচে বদলে ফেলে ভবিষ্যতের জন্য একটি টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলার।
লেখক: গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)





