দিন যায়...

ভাদ্রের উষ্ণ এক দিনে। ছবি: এআই ব্যবহার করে বানানো
অধীর বাবুর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসালয়ের বাইরে চক চক করছে ভাদ্র মাসের রোদ, আকাশে কেমন দুধের মতো সাদা রঙ। বারান্দার কোনায় যথারীতি মাকড়সায় জাল বুনে চলেছে আগামী শীতের কথা ভেবে। ভাদ্রের দিন একটু একটু করে এগোয় কচ্ছপের মতো। বাড়ইপাড়ার কাছে পুকুরের টান ধরা সবুজ পানিতে মাছেদের শরীরের ছায়া ভেসে ওঠে; গ্রামের পর গ্রামের আকাশ একমনে সেই ছায়া দেখে। এলোমেলো বাতাস ভেদ করে ঘুঘু ডেকে ওঠে কাছেই কোথাও। অধীর বাবুর চিকিৎসালয়ে এখন তেমন রোগী আসে না, সন্ধ্যাবেলা গ্রামের কয়েকজন বৃদ্ধ আসেন পত্রিকা পড়তে। কোনোদিন হ্যারিকেন জ্বলে বিদ্যুতের অভাবে। অধীর বাবু কাঠের চেয়ারে নিঃস্পন্দ বসে থাকেন র্যাকে সাজানো ছোট ছোট শিশি-বোতলের দিকে তাকিয়ে।
ভীষণ গরমে ভাদ্রের দিন মন্থর। হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা রোগীর মতো হাঁসফাঁস করে। গ্রামের জীবনে তোষা পাটের আঁটি ঘুমায় বাড়ির পাশের ডোবায়। পাট পচার গন্ধ বাতাস ভারী করে রাখে। কেউ কেউ ছিপ কাঁধে ফেলে খালুই ভর্তি মাছ নিয়ে বাড়ি ফেরে বিকালে রোদ পড়ে যাওয়ার পর। কারও হাতে থাকে কালো, গম্ভীর তাল। সেই কোন সকালে তারা বের হয়েছিল পান্তা ভাত আর সঙ্গে কাঁচা মরিচ-পেঁয়াজ ডলে খেয়ে। তারা ফিরে এসে আবার ভাত খাবে রান্নাঘরের সামনে বাঁধা ছোট চালার নিচে বসে। তারা নিজেদের মধ্যে নিচুস্বরে অনেক কথা বলবে। তখন পুবের ঘরের পেছনে মাচার ওপর শুয়ে থাকা চালকুমড়ার শরীরে শিশিরের মতো বড় হয় অসংখ্য সূক্ষ্ম রোম ঝরে পড়ার জন্য।
গ্রামে ভাদ্র মাসে সন্ধ্যার আকাশে নিঃশব্দে নিয়ম করে ফুটে ওঠে ভাদ্রপদ নক্ষত্র অ্যান্ড্রোমিডা তারামণ্ডলের সীমানায়। শহরে ভাদ্রের আকাশের দিকে তাকানোর অবকাশ কার আছে? ক্ষ্যাপাটে শহরের এক জীবনপ্রবাহ বয়ে চলেছে এখানে। বিদ্যুতের ক্লান্তিহীন লোডশেডিং আর গ্যাসের চুলায় আগুন বাড়ন্ত এই শহরে অচেনা অ্যান্ড্রোমিডা তারামণ্ডলের সীমানায় কোন নক্ষত্র মহাকালকে পাহারা দেয় তা জানার আগ্রহ কারও আছে বলে মনে হয় না। শহরের মানুষের নিত্য দাবি-দাওয়ার জীবন। ভাদ্র মাস সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে কখনো মাথা ঘামিয়েছে বলে মনে হয় না। সংবিধানের ১৪২ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গেও ভাদ্রের তাপমাত্রার ক্রমাগত বেড়ে যাওয়ার কোনো সম্পর্ক নেই। শহরে অধীর বাবুর হোমিওপ্যাথি চিকিৎসালয়ের বারান্দায় মাকড়সার একমনে জাল বুনে যাওয়া নেই। এক ডজন ডিমের দাম হ্রাস পেলে, কম দামে মাছ অথবা সবজি মিললে নাগরিকরা ঘরে ফিরে গল্প করার বিষয় পেয়ে যান।
দিন যায়। কখনো আকাশ মুখ কালো করে রাখে। কখনো বৃষ্টি নামে। আবার কখনো নীল আকাশ ভরে ওঠে খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘে। ভাদ্রের দিন বয়ে চলে মন্থর গতিতে। তবুও কখনো স্থির হয়ে কোথাও দুদণ্ড বসে থাকলে দৃষ্টিগোচর হয় ছোট ছোট সাদা তুলার আঁশের মতো বস্তু এলোমেলো বাতাসে ভাসছে। এগুলো কাশফুল ফোটার সংকেত বহন করে। ভাদ্র ফুরালেই তো আশ্বিন মাস। কাশফুল ফুটবে নদীর ধারে, ফুটবে শহরের কোনো কোনো খোলা জায়গায়। ভোরের বাতাসে সামান্য ঠান্ডা স্পর্শ টের পাওয়া যাবে, রাতে হয়তোবা মৃদু শিশির পড়তে শুরু করবে। এই বিমুখ প্রান্তরে দুর্গাপূজা উৎসবের ছোঁয়া নিয়ে আসবে। চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায় তালের পিঠা তৈরি হবে বহু বাড়িতে। মানুষ দলবদ্ধ হয়ে ছুটবেন কাশফুলের সমারোহে নিজেদের ছবি তুলতে।
বিদ্যাপতি এই ভাদ্র মাস নিয়ে কবিতা লিখেছিলেন, ‘এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর’। প্রিয়ার অনুপস্থিতির অনুভূতি তার মনের মধ্যে হাহাকার হয়ে বেজেছিল এই ভাদ্র মাসেই। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা গল্প ‘তালনবমী’। সেখানে তখনকার ভাদ্র মাসে গ্রামীণ সমাজে অভাবের চিত্র ফুটে উঠেছে। বিভূতিভূষণ লিখেছেন, ‘ভাদ্র মাসের দিন। আজ দিন পনেরো ধরে বর্ষা নেমেছে, তার আর বিরামও নেই, বিশ্রামও নেই। এই ভীষণ বর্ষায় গ্রামের কত গৃহস্থের বাড়িতেই পুত্র-কন্যা অনাহারে আছে। ভাদ্রের শেষে আউশ ধান চাষিদের ঘরে উঠলে তবে আবার কিছু ধান ঘরে আসবে, ছেলেপুলেরা দুবেলা পেট পুরে খেতে পাবে’।
ভাদ্র মাসে মানুষের বেদনার ছবি বাংলা সাহিত্যে এভাবে আঁকা হয়ে আছে। এখনো সেই ছবি মিলিয়ে যায়নি মানুষের জীবন থেকে। শহর অথবা গ্রামে এখনো ভাদ্র মাস ক্যালেন্ডারের পাতায় এলোমেলো হাওয়ায় দুলে ওঠে। নাগরিক জীবনের শত চাপ আর গ্রামীণ জীবনে ছড়িয়ে থাকা এক ধরনের ঔদাস্য নিয়ে আমাদের দিনগুলো মন্থর ভাদ্র মাসের সঙ্গে এগিয়ে চলবে সুসংবাদের আশায়।








