আয়না অনেক গল্প জানে...

আয়নার কাছে কোন গল্প জমা থাকে? খণ্ড কাচ নানা মাপে কেটে ঝুলিয়ে অথবা গেঁথে আমরা দেয়ালে গেঁথে রাখি। নিজেকে দেখার তীব্র আকাঙ্খা থেকে মানুষ-ই তৈরি করেছে আয়নার কারিগরি কৌশল। আয়নায় কাকে দেখে মানুষ? সহজ উত্তর হচ্ছে-নিজেকে। কিন্তু শরীর এবং আত্মায় বিভাজিত মানবের সব রহস্য কি এক খণ্ড আয়না ধারণ করতে সক্ষম? মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন, কোনো একটি অন্ধকার ঘরে কেউ যদি একটি আয়না থেকে ১০ ইঞ্চি দূরে নিজের মুখ স্থাপন করে একটানা ৩০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকে তাহলে তার মনের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হতে শুরু করে। তখন মানুষের মন যা তার ধারণাকে প্রতিফলিত করে এবং আয়নায় ফুটে ওঠা তার দেহের মাঝে বিভাজন রেখা তৈরি হয়। তৈরি হতে থাকে দুটি পৃথক সত্তা। তখন মানুষের মন প্রতিফলিত নিজের অবয়বের বাইরে গিয়ে ভিন্ন কিছু ভাবতে শুরু করে।
মার্কিন কবি সিলভিয়া প্লাথ আয়নায় নিজের কিশোরী রূপকে মরে যেতে দেখতে পেতেন। তিনি দেখতেন, তার নিজের অবয়বের বদলে আয়নায় ধরা পড়ছে জীর্ণ, বৃদ্ধ অবয়ব। লুইস ক্যারলের ‘থ্রু দ্য লুকিং গ্লাস’ উপন্যাসের এলিস আয়নাকে নরম বস্তুতে পরিণত হতে বলেছিল যাতে সে আয়নার ভিতরে প্রবেশ করতে পারে।
পৃথিবীর সবচাইতে পুরনো আয়নাটির চিহ্ন খুঁজে পাওয়া গেছে আনাতোলিয় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ থেকে। মিশর অথবা মেসোপটেমিয়ার পাশাপাশি চীনেও পাওয়া যায় আদি আয়নার চিহ্ন। আয়নায় শুধু মানুষের দেহ নয়, রূপ নয়, উপচে পড়া যৌবন নয়, রুগ্ন জীবনের অচেনা ছবিও প্রতিফলিত হয় কখনো। মুখ দেখার জন্য বা গালের ছোট্ট একটি দাগকে চিহ্নিত করার জন্য যে আয়না ব্যবহার করি উৎপত্তির শুরুতে তার আদল এরকম ছিল না। সেই প্রাচীন সময়ে কাচের বদলে তামা, ব্রোঞ্জ, সোনা বা রূপার চকচকে পৃষ্ঠদেশ আয়না হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু এই ধাতুগুলো খুব ভারী হওয়ায় তাতে পরিস্কার ভাবে মুখ দেখা সম্ভব হতো না। তারপরেও প্রাচীন সমাজে আভিজাত্যের প্রতীক ছিল এই আয়না। রোমানরা মনে করতো, মানুষের সাতটা জন্ম থাকে। কেউ যদি কোনো এক জন্মে আয়না ভেঙে ফেলে তাহলে সেই ভাঙা আয়নার টুকরোগুলোর ভিতরে সেই মানুষটির আত্মা আটকা পড়ে যায়। আবার পুর্নজন্ম লাভের আগে তার আত্মা আর মুক্তিলাভ হয় না।
ছোট্ট সেলুনে সস্তা পারদের কারণে ঢেউ খেলে যাওয়া আয়নায় নিজের মুখ দেখে কেউ অবসরে। তখন হয়ত মফস্বল জুড়ে বৃষ্টি নেমেছে। আর্শীর আত্মার কাছে নিবেদিত হয়ে কেউ একদৃষ্টিতে দেখে নিজেকে। অলস সময় তার চোখের সামনে পুনরায় প্রদর্শন করে পুরোটা জীবন। হাজার বছর আগে ক্লিওপাট্রা আয়নায় তাকিয়ে খুঁজে নিতে চেয়েছিল নিজের রূপ-যৌবনকে। রোমান সেনাপতি মার্ক অ্যান্টনির প্রেমে উজাড় হয়ে যাওয়া চোখ কি তাকে সে উত্তর দিতে পেরেছিল? আয়না অনেক গল্প জানে। আর জানে বলেই ভুবনমোহিনী অভিনেত্রী মেরিলিন মনরো ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতেন আয়নার সামনে। তিনি যদিও জানতেন, অসংখ্য আলোকচিত্র শিল্পীর ক্যামেরার ফ্ল্যাশ তাকেই খুঁজছে। তবুও আয়নার সামনে নিভৃতিতে হয়ত নিজেকেই খুঁজে পেতে চাইতেন মনরো।
প্রাচীন উপকথার গল্পে আয়নার উল্লেখ পাওয়া যায়। বহু বছর আগে হিমালয়ের কাছে কোনো এক স্থানে এক নারী সরোবরে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে চমকে উঠেছিল। সেটাই নাকি ছিল প্রাচীন আয়নার ধারণা। তারপর একটু একটু করে শুরু হয়েছে মানুষের মধ্যে আয়না তৈরির আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আয়না মানুষের শরীর অথবা মনের প্রকৃতিকে ধারণ করে। মানুষের মুখ অথবা শরীর আয়নায় প্রতিফলনের প্রধান বিষয়। আয়না সৌন্দর্যকে জানে। আয়না ভাঙাচোরা জীবনের গল্পকেও জমিয়ে রাখে। আয়না প্রতিফলন, প্রতিসরণের বৈজ্ঞানিক নিয়ম মেনে জমা রাখে আমাদের অনেক গল্প।




