তেলাপোকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
তিনটি তেলাপোকা একদিন হাজির হলো ঈশ্বরের দরবারে। সামনের ক্ষুদ্র প্রাণীগুলো দেখে সোজা হয়ে বসলেন। কিছুটা মোলায়েম গলায় বললেন, ‘কী ব্যাপার, কোনো সমস্যা তোমাদের?’
মাথার শুঁড় দুটো নাড়িয়ে প্রথম তেলাপোকা বলল, ‘হে ঈশ্বর, জন্মের পর থেকেই অন্ধকারে, নোংরা ভেজা জায়গায় বাস করে আসছি আমরা। জগতের আজেবাজে জিনিস খেয়েও থাকতে হয় আমাদের। মানুষ আমাদের দেখলেই পা দিয়ে পিষে মারে। আমাদের জীবন কি এভাবেই কাটবে?’
‘তুমি কি কোনো প্রস্তাব নিয়ে এসেছ, প্রস্তাবটা বলো।’
‘আমাদের এমন কিছু একটা দিন, যাতে আমরা একটু ভালোভাবে জীবন কাটাতে পারি।’
সেকেন্ড-তিনেক ভেবে ঈশ্বর বললেন, ‘তোমাদের পাখা আছে। যাও, আজ থেকে যখন-তখন, প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে উড়তে পারবে তোমরা।’
ডানা দুটো ঝাপটাল তেলাপোকাটি। তারপর উড়তে উড়তে চলে গেল সে। কিছুটা পাখির মর্যাদায় পেয়ে বেশ পুলকিত দেখাল তাকে।
দ্বিতীয় তেলাপোকার দিকে তাকালেন ঈশ্বর, ‘তুমি কিছু বলবে?’
‘হে আমার জীবনদাতা, আমি অন্যরকম একটা ক্ষমতা চাই।’
আগের মতোই সেকেন্ড-তিনেক ভাবলেন ঈশ্বর, ‘আমার সৃষ্টির সবচেয়ে সাহসী ও জেদি প্রাণীটা তোমাকে দেখে ভয় পাবে। তাদের গায়ে সামান্য স্পর্শ করতেই তারা ওয়াও করে চিৎকার করে উঠবে, হাত-পা নাচিয়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করবে।’
ঈশ্বরের কথা শুনে বাইরে এসে সে একটা মেয়ের হাতে বসল। সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা ওয়াও করে চিৎকার দিল, তারপর হাত-পা নাচিয়ে ব্যালান্স রাখতে না পেরে পড়ে গেল পাশের ড্রেনে।
তৃতীয় তেলাপোকাটি দাঁড়িয়ে ছিল চুপচাপ। ঈশ্বর গম্ভীর গলায় বললেন, ‘তোমাকে আমি অন্যরকম একটা জিনিস দেব। আপাতত সেটা বুঝতে পারবে না তুমি। যথাসময়ে বুঝবে। অন্যরকম একটা মর্যাদায় ভূষিত হবে তোমরা।’
কিছু তথ্য: তেলাপোকা হচ্ছে Blattodea বর্গের একটি পোকা, যা পৃথিবীর সব জায়গায় পাওয়া যায়। ৪ হাজার ৬০০ প্রজাতির বেশি আছে এই পোকাটি, যার মধ্যে ৩০ প্রজাতি মানুষের বাড়িঘরে বাস করে। স্ত্রী তেলাপোকা ডিমের একটি ক্যাপসুল তৈরি করে, যাতে অনেকগুলো ডিম থাকে। দ্রুত বংশ বৃদ্ধি করে এরা, বাঁচে এক থেকে দুই বছর।
খাবার ও পানি ছাড়া এরা টিকে থাকতে পারে বেশ কয়েক দিন।
১৯৮২ সাল থেকে অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেন শহরের স্টোরি ব্রিজ হোটেলে ২৬ জানুয়ারি অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দিবসে এক দৌড়ের আয়োজন হয় তেলাপোকাদের। এই আয়োজন থেকে সংগৃহীত অর্থ দাতব্য কাজে ব্যয় করা হয়।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় তেলাপোকার এক প্রজাতি আছে, যারা সরাসরি বাচ্চা জন্ম দেয় এবং তাদের ভ্রণকে দুধের মতো তরল দেখায়। ২০১৬ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই দুধের পুষ্টিগুণ মহিষের দুধের চেয়ে তিনগুণ, গরুর দুধের চেয়ে চারগুণ।
চীনে শত শত তেলাপোকার খামার আছে। সিচুয়ান প্রদেশের শিছাং শহরে অবস্থিত এক কোম্পানিতে ৬০০ কোটি তেলাপোকা উৎপাদিত হয়। শূকর ও মাছ চাষের খামারে পশুখাদ্য ও ওষুধ কোম্পানির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় এসব। শহরের প্রচুর খাদ্য-বর্জ্য এই তেলাপোকাদের খাইয়ে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরিত করা হয়। ২০১৮ সালে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি তেলাপোকা থেকে তৈরি শ্বাসকষ্ট ও পাকস্থলীর সমস্যা নিরাময়কারী ওষুধ বিক্রয় করে ৬৮ দশমিক ৪ কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছিল।
সাহিত্যে: বিজ্ঞ মানুষদের মাঝে তেলাপোকার খাঁটি মর্যাদা বুঝতে পেরেছিলেন সর্বপ্রথম ফ্রানৎস কাফকা। তা না হলে তিনি কেন তার বিখ্যাত গল্প The Metamorphosis-এ পৃৃথিবীর আর কোনো পোকাকে না এনে আনলেন তেলাপোকাকে, সেই ১৯১৫ সালে! গল্পের নায়ক এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন তিনি নিজে বিশাল এক পোকায় রূপান্তরিত হয়েছেন!
কেন বাবা, রূপান্তর যদি হবিই, তাহলে তেলাপোকা কেন? বনের রাজা সিংহ হ, কিংবা বর্ণিল প্রজাপতি হ, তা না হলে সুস্বাদু বারি-৪ আম হ। তা না, হলেন তেলাপোকা!
আর আমাদের শরৎচন্দ্রও তার বিখ্যাত গল্প ‘বিলাসী’তে কী একটা বাণী দিয়েছেন— অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।
শিল্পীমনে: বিখ্যাত পরাবাস্তববাদী শিল্পী সালভাদর দালি ১৯২৬ সালের এক সকালে প্যারিসের এক হোটেলের রুমে শুয়ে ছিলেন। হঠাৎ ছাদে একটা পোকা হামাগুড়ি দিয়ে হাঁটতে দেখেন তিনি। অস্থির হয়ে যান খুব। তার মনে হয়— শরীরে কিছু একটা কামড়িয়েছে। এই পোকাটি বেডবাগ কিংবা তেলাপোকা কি না, তা নিশ্চিত হতে না পেরে নিজের পিঠের একটা ফোলা অংশ নখ দিয়ে খুঁটে তুলতে চেষ্টা করেন, রক্তারক্তি অবস্থা তার।
শেষমেশ ডাক্তার এসে জানালেন— ওটা আসলে তেলাপোকা বা বেডবাগ ছিল না, নিছক একটা জন্মদাগ ছিল, যা তিনি আগেও অনেকবার দেখেছেন!
সিনেমায়: বিখ্যাত সিনেমা Shawshank Redemption-এর লাও মোর একদিন শুয়েছিলেন কারাগারের গুমোট কক্ষে। হঠাৎ একটি তেলাপোকা দেখতে পান তিনি, সেটি ধীরে ধীরে চলে যায় পাশের ছোট্ট জানালা দিয়ে। অসাধারণ বুদ্ধিমানবন্দি লাও মোর সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারেন— সাগরের মাঝখানের এই কারাগারটি অনেক পুরনো। এর দরজা-জানালা-আসবাবপত্র অনেক নড়বড়ে।
এই তেলাপোকা দেখেই পালানোর চিন্তা আসে তার মাথায় এবং একসময় পালাতে পারেন তিনি।
খাদ্য: তেলাপোকা থেকে একধরনের আটা তৈরি করা হয়, ব্রাজিলে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই আটায় গমের আটার চেয়ে অনেক বেশি প্রোটিন থাকে, ৬৩ দশমিক ২২ শতাংশ, গমের আটায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ।
থাইল্যান্ড, চীনসহ বিভিন্ন দেশে ভাজা তেলাপোকা Street Food হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
প্রথম: রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা ২০০৭ সালে Foton-M মহাকাশযানে নাদেজদা নামে একটি তেলাপোকা পাঠান মহাকাশে। ১৪ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর সময়ের মহাকাশ ভ্রমণের সময় গর্ভধারণ করে সে এবং পৃথিবীতে ফিরে এসে ৩৩টি বাচ্চা জন্ম দেয়।
এটিই বিজ্ঞানের ইতিহাসের কোনো প্রাণী, যে মাধ্যাকর্ষণহীন অবস্থায় (Zero Gravity) গর্ভধারণ করে সন্তান জন্ম দিয়েছিল।
তৃতীয় তেলাপোকাটি আবার ঈশ্বরের মুখোমুখি: ঈশ্বর সেই তৃতীয় তেলাপোকাটিকে দেখতে পেলেন আবার। খুব মন খারাপ করে তেলাপোকাটি বলছিল, ‘হে ঈশ্বর, আপনার সেই অন্যরকম মর্যাদা কী, এতদিনে আমরা তা বুঝতে পারিনি। যদি একটু বুঝিয়ে দিতেন।’
‘আমি তোমাদের সর্বভুক প্রাণী বানিয়েছি। কিন্তু আরও একটা প্রাণী বানিয়েছি আমি, যারা আরও বেশি সর্বভুক! তারা নদী খায়, সরকারি জমি খায়, অন্যের সম্পদ খায়, নিজের সম্মান খায়, সেবা দিতে নিয়ে অন্যের পকেটের টাকা খায়, স্বার্থের দ্বন্দ্বে মানুষ হয়ে মানুষের প্রাণ খায়, নীতি খায়, মনুষ্যত্ব খায়, মানবিকতা খায়, মানুষ হয়ে মানুষের পরিচয় খায়।’ ঈশ্বর একটু থেমে বললেন, ‘আরও শুনবে?’
মাথার সামনের শুঁড় দুটো উঁচু-নিচু করল তেলাপোকাটি।
‘মাথা ছাড়া বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারো তোমরা। আর একটা প্রাণীকে মাথা দিয়ে সৃষ্টি করেছি আমি। কিন্তু মাথার কোনো কাজই নেই তাদের। তারা হাসপাতাল বানায়, সেই হাসপাতালে চিকিৎসা হয় না, সেই হাসপাতালের সব
যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত। তারা ব্রিজ বানায়, ব্রিজের দুপাশে রাস্তা থাকে না তাদের। তারা প্রতিদিন বিষযুক্ত খাবার খায়, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়াহীন। তারা নির্বাচন করে বারবার, কিন্তু কোনো সৎ শাসক পায় না কোনো দিন। তারা যে দেশকে ব্যবহার করে সম্পদের পাহাড় গড়ে, সেই সম্পদ নিজ দেশে রাখে না, পাচার করে অন্য দেশে। দুর্নীতি প্রতিদিন কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই! মাথা নিয়ে মাথাবিহীনের মতো দিব্যি বেঁচে থাকে তারা, মারা যায় ওই অব্যবহৃত মাথা নিয়েই।’ ঈশ্বর মুচকি হাসলেন, ‘আমি তোমাদের সেই মানুষের কাতারে নিয়ে এসেছি, মর্যাদায় সমান করেছি। এই তো, এই তো দুদিন আগে তোমাদের মতো পোকার নাম ব্যবহার করে এক দেশের এক শিক্ষামন্ত্রীকেও পদত্যাগ করিয়েছে প্রতিবাদী কিছু মানুষ।’ শব্দ করে হাসলেন আবার ঈশ্বর, ‘এবার তুমিই বলো, কারা এখন শ্রেষ্ঠ— মানুষ, না তেলাপোকা?’




