মার্কিন সেফ হাউজে ছিলেন না সমন্বয়করা, দাবি রিফাত রশিদের

ফরহাদ মজহার ও রিফাত রশিদ
চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন নিয়ে সম্প্রতি একটি পডকাস্টে কবি, বিশ্লেষক এবং বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহারের ‘মার্কিন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছাআ) সাবেক সভাপতি। আজ রবিবার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ প্রশ্ন তোলেন।
রিফাত রশিদ বলেন, আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের আশ্রয় নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত সেফ হাউজগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছিল বলে ফরহাদ মজহার দাবি করেছেন। তবে রিফাতের দাবি, আন্দোলনের ওই সময়ে তারা যেসব জায়গায় আশ্রয় নিয়েছিলেন, সেগুলোর কোনোটিই যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ছিল না।
পোস্টে রিফাত রশিদ লেখেন, ‘ফরহাদ ভাই আজ দু’বছর পর দাবি করে বসলেন, সেফ হাউজগুলো যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে চলেছে। আমি জানি না, তার সোর্স কী, তিনি কোথা থেকে এগুলো শুনে এসেছেন বা কারা তাকে বলেছে। যারাই বলুক, তারা অসৎ উদ্দেশ্যে বলেছে।’
বিষয়টি ক্রসচেক করা যেত উল্লেখ করে রিফাত বলেন, ‘আপনি ক্রসচেক করতে জানেন, আমাদের সবাইকেও চেনেন। একটা ফোনকল করে আমাদের জিজ্ঞেস করলে আপনার কাজটা সহজ হয়ে যেত। কিন্তু আপনি সেটা করলেন না, মিডিয়ায় বলে দিলেন এমন কিছু, যা মিথ্যা।’
আন্দোলনের সময় আশ্রয় নেওয়ার বিস্তারিত তুলে ধরেন রিফাত। তার ভাষ্য, ‘আমি, হান্নান মাসউদ, মাহিন সরকার— এই তিনজন উত্তরার কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল থেকে হাসিনার গোয়েন্দা সংস্থার তাড়া খেয়ে আশ্রয় নিই বাংলাদেশের একটি মানবাধিকার সংস্থার অফিসে, এক রাতের জন্য। এই শেল্টারের ব্যবস্থা করেছেন মুনতাসীর ভাই। সেখান থেকে আমরা আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের বন্ধুর একটা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে আশ্রয় নিই। সেখান থেকে আমরা যাই পাঠাওয়ের সিইও ফাহিম-আন্দালিব দম্পতির বাসায়। সেখান থেকে আমাদের পিক করেন মানবাধিকারকর্মী লেলিন ভাই, শুরুতে আমাদের সদরঘাটের কাছের একটা গেস্ট হাউজে নেওয়ার কথা বলা হয়। পরে তিনি আমাদের নিয়ে যান তৎকালীন বিএনপি নেতা ওয়াহিদ আলমের ডিওএইচএসের অফিসে। এই কানেকশনটা আমাদের করান জুলকারনাইন সায়ের।’
পরে ৩ আগস্ট বিকালে তারা শেরপুর-২ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরীর বাসায় যান বলে জানান রিফাত। ‘‘সেখান থেকে আমি এবং মাহিন ভাই আশ্রয় নিই মোহামিন পাটোয়ারীর বাসাতে। আব্দুল কাদের শুরুতে শিবিরের ব্যবস্থা করা একটা শেল্টারে ছিলেন, তারপর সেখান থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের কর্মকর্তা তাইসির ভাইয়ের বাসায়। এই হলো আমাদের পুরো সময়ের ‘সেফ হাউজ’-এর বিস্তারিত।’’
রিফাত প্রশ্ন তোলেন, ‘এখানে যুক্তরাষ্ট্র অ্যামবাসির তৈরি করা সেফ হাউজ কোনটা? আমরা তো সবার বাসাবাড়িতে থেকেছি। স্কুল বন্ধ থাকায় সেখানে থেকেছি। নয় তো কারও ব্যক্তিগত অফিসে থেকেছি। কমিউনিকেশনের ক্ষেত্রে যারা ছিলেন তারা ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের সর্বজনবিদিত পরীক্ষিত যোদ্ধা।’
তিনি দাবি করেন, আন্দোলনের ওই সময়ে যারা তাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, তারা কেউ কোনো ধরনের পরামর্শ দিতে আসেননি। তবে ২ আগস্ট রাতে এক দফা নিয়ে তাদের পরামর্শ দিতে কেউ এসেছিলেন। তারা সেই পরামর্শ গ্রহণ করেননি। রিফাত বলেন, ‘বরং এক দফার ঘোষণার লাইন কী হতে পারে, সেটা নিয়ে পরামর্শ করার জন্য আমি ২ আগস্ট রাতে ফরহাদ মজহার ভাইকেই কল দিয়েছিলাম। তার বেশ কিছু পরামর্শ আমরা নোটও করেছিলাম।’
ফরহাদ মজহারের বক্তব্যের সমালোচনা করে এই ছাত্রনেতা বলেন, ‘যেখানে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে এক দফার ঘোষণায় পরামর্শ নিয়েছিলাম, সেখানে তিনিই এই প্রক্রিয়াকে আওয়ামী লীগের বয়ানে আমেরিকান ষড়যন্ত্রতত্ত্বের আলাপ দিলেন। এই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব খোঁজাটা সমস্যাজনক।’ তার দাবি, ‘এই বয়ানের পর তিনি আওয়ামী লীগের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছেন।’ তবে ফরহাদ মজহারের প্রতি তার শ্রদ্ধার কথাও তুলে ধরেন রিফাত রশিদ।
তিনি উল্লেখ করেন, ‘ফরহাদ ভাইয়ের চিন্তা, লড়াই আর নিজের আদর্শের প্রতি অটল থাকার দৃঢ়চেতা মনোভাব আমাদের আকর্ষিত করেছে। রাজনৈতিক ক্ষুধা থাকা বাংলাদেশের তরুণরা ফরহাদ ভাইয়ের কাছে গিয়েছে তাদের জ্ঞান শানিত করার জন্য।’
রিফাত মনে করিয়ে দেন, ফরহাদ মজহারের ‘ভাববৈঠকী’র মাধ্যমে তারা সিভিল সোসাইটির একটি বড় নেটওয়ার্কের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। তার দাবি, মুনতাসীর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও এই নেটওয়ার্ক ভূমিকা রেখেছিল।
পোস্টের শেষ দিকে ফরহাদ মজহারের কাছে সরাসরি প্রশ্ন রাখেন রিফাত। বলেন, ‘এখন ফরহাদ ভাই এত বছর ধরে গড়ে তোলা নিজ কমিউনিটিকে আমেরিকান মদদপুষ্ট গোষ্ঠী বলবেন কি না, এই প্রশ্নের উত্তর উনিই দিন। যদি তা হয়, তাহলে আমরাই বরং চিটেড ফিল করব।’
রিফাত আশা প্রকাশ করেন, তার উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবেন ফরহাদ মজহার।
উল্লেখ্য, ফরহাদ মজহার ওই পডকাস্টে বলেছিলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় সমন্বয়কদের বিভিন্ন দূতাবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। তিনি আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট আরও কিছু বিষয় নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু বিদেশি দূতাবাস আন্দোলনকারীদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য সেফ হাউজ পরিচালনা করেছিল। সে সময় প্রাণে বাঁচতে কিছু সমন্বয়ক দূতাবাসের আশ্রয়ও চেয়েছিলেন। এসব সেফ হাউজে সমন্বয়কদের মগজধলাই করা হয়েছে। তারা যেন শেখ হাসিনার পদত্যাগ চান, সেভাবেই তাদের বলা হয়েছে। তিনি এক্ষেত্রে মার্কিন দূতাবাসকে দায়ী করেছেন।




