দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ইসলামের বাজারনীতি

প্রতীকী ছবি
দ্রব্যমূল্যের ওঠানামা মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিশেষ করে খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে গেলে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে সীমিত আয়ের মানুষ। ইসলাম অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে শুধু মুনাফা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখনা। ইসলাম বাজারকে ন্যায়, আমানতদারি ও পারস্পরিক কল্যাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত করার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে ইসলামের বাজারদর্শনে ব্যবসায়ীর লাভ যেমন স্বীকৃত, তেমনি ক্রেতার অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পবিত্র কোরআন ব্যবসা-বাণিজ্যের বৈধতাকে স্বীকার করে বলেছে, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৭৫)। অর্থাৎ ইসলাম বৈধ ব্যবসা ও মুনাফাকে নিষিদ্ধ করেনি। তবে এই বৈধতার সঙ্গে নৈতিকতার শর্তও যুক্ত করে দিয়েছে। পবিত্র কোরআনে অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ করতে নিষেধ করে বলেছে, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে তা ভিন্ন।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ২৯) এই আয়াত বাজারে স্বেচ্ছাসম্মত লেনদেন, স্বচ্ছতা ও অন্যায় শোষণ থেকে বিরত থাকার মৌলিক নীতি নির্দেশ করে।
ইসলামের বাজারব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ওজন ও পরিমাপে সততা। কোরআনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ‘ধ্বংস তাদের জন্য, যারা মাপে কম দেয়। যারা মানুষের কাছ থেকে মেপে নেওয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, কিন্তু যখন তাদের মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়।’ (সুরা আল-মুতাফফিফিন, ৮৩:১-৩)। অর্থাৎ পণ্যের দাম নির্ধারণের পাশাপাশি পণ্যের পরিমাণ ও মানের ক্ষেত্রেও ব্যবসায়ীর সততা নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্রব্যমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর একটি কারণ হতে পারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি। ইসলাম এ ধরনের মজুতদারিকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘পাপাচারী লোক ব্যতীত কেউ গুদামজাত করে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৬০৫)। ফকিহদের আলোচনায় ইহতিকার বা মজুতদারি বলতে সাধারণত মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য আটকে রেখে সংকট সৃষ্টি এবং মূল্য বৃদ্ধির সুযোগ নেওয়াকে বোঝানো হয়েছে। তাই স্বাভাবিক ব্যবসায়িক মজুত এবং মানুষের দুর্ভোগ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরির মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি।
তবে ইসলামী বাজারদর্শনকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয় যে, বাজারে যেকোনো মূল্যবৃদ্ধিই অবৈধ। চাহিদা ও জোগানের স্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে মূল্য বাড়তে বা কমতে পারে। একবার মদিনায় পণ্যের দাম বেড়ে গেলে সাহাবিরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে মূল্য নির্ধারণের অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহই মূল্যের গতি নির্ধারণকারী, তিনিই তা কমান ও বৃদ্ধি করেন এবং একমাত্র তিনিই রিযিকদাতা। আমি এই আশা করি যে, আমি আল্লাহর সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করবো যেন আমার উপর কারো জীবন বা সম্পদের উপর জুলুম করার কোনোরূপ অভিযোগ না থাকে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৪৫১) এই হাদিস থেকে ফকিহরা বাজারে সরাসরি মূল্য নির্ধারণের বিষয়ে সতর্কতার কথা বলেছেন। প্রয়োজন মূল্য বৃদ্ধি করা যাবে তবে তা যেনে া কোনোভাবেই জুমুল না হয়।
বাজারে স্বচ্ছতার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতারণাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। তিনি খাদ্যদ্রব্যের একটি স্তূপের ভেতরে হাত দিয়ে ভেজা অংশ পাওয়ার পর বলেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসলিম, হাদিস : ১০২) এর মাধ্যমে পণ্যের প্রকৃত মান গোপন করা, নিম্নমানের পণ্যকে ভালো পণ্য হিসেবে বিক্রি করা এবং ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করার মতো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
অতএব ইসলামের বাজারদর্শনের মূল কথা শুধু ‘কম দামে পণ্য বিক্রি’ নয়; বরং ন্যায্য লেনদেন, স্বচ্ছতা, প্রতারণামুক্ত বাজার, কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ এবং মানুষের অধিকার সংরক্ষণ। ব্যবসায়ী তার বৈধ মুনাফা অর্জন করবেন, ক্রেতা ন্যায্য দামে মানসম্মত পণ্য পাবেন এবং রাষ্ট্র বাজারে অন্যায় কারসাজি প্রতিরোধ করবে। এ তিন পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণই ইসলামী অর্থনৈতিক নৈতিকতার ভিত্তি। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় তাই শুধু দাম কমানোর দাবি নয়, বরং বাজারের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নটিও সমান গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



