ফুটপাত দখল: ইসলামে কতটা গুরুতর অপরাধ

সংগৃহীত ছবি
ঢাকার কোনো ব্যস্ত সড়কের ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে বের হলে অনেক সময় মনে হয়, ফুটপাতটি পথচারীদের জন্য নয়। কোথাও দোকানের পণ্য, কোথাও রেস্তোরাঁর চেয়ার-টেবিল, কোথাও ফলের দোকান, কোথাও মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত গাড়ি। কোনো কোনো স্থানে নির্মাণসামগ্রীও পড়ে থাকে দিনের পর দিন। ফলে ফুটপাতের ওপর দিয়ে হাঁটার পরিবর্তে মানুষকে নেমে আসতে হয় মূল সড়কে। কয়েক ফুট জায়গা দখল করে একজন হয়তো নিজের ব্যবসার পরিসর বাড়াচ্ছেন, কিন্তু তার সেই সুবিধার মূল্য দিতে হচ্ছে অসংখ্য পথচারীকে।
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন হাঁটেন। অথচ নিরাপদ হাঁটার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো অনেক জায়গাতেই অপর্যাপ্ত, বিচ্ছিন্ন কিংবা দখলকবলিত। ফলে ফুটপাত দখল শুধু নগর সৌন্দর্যের সমস্যা নয়; এটি মানুষের নিরাপত্তা, চলাচলের অধিকার এবং সামাজিক নৈতিকতারও এক বড় প্রশ্ন।
ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি আরও গভীর। কারণ জনপথে মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা শুধু একটি নাগরিক অপরাধ নয়; এটি অন্যের অধিকার হরণের সঙ্গেও সম্পর্কিত। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
عَنْ سَهْلِ بْنِ مُعَاذِ بْنِ أَنَسٍ الْجُهَنِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: غَزَوْتُ مَعَ نَبِيِّ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غَزْوَةَ كَذَا وَكَذَا، فَضَيَّقَ النَّاسُ الْمَنَازِلَ وَقَطَعُوا الطَّرِيقَ، فَبَعَثَ نَبِيُّ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُنَادِيًا يُنَادِي فِي النَّاسِ أَنَّ مَنْ ضَيَّقَ مَنْزِلًا أَوْ قَطَعَ طَرِيقًا فَلَا جِهَادَ لَهُ
সাহল ইবনু মু‘আয ইবনু আনাস আল-জুহানি তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। একবার সৈনিকেরা এমনভাবে তাঁবু স্থাপন করেছিলেন যে জায়গা সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল এবং চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) একজন সাহাবিকে লোকদের মধ্যে ঘোষণা করার জন্য পাঠালেন, ‘যে ব্যক্তি স্থান সংকীর্ণ করেছে এবং চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে, তার জিহাদ নেই।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৬২৯)
হাদিসটির প্রেক্ষাপট যুদ্ধের ময়দান। তাই এর প্রত্যক্ষ বিধান সেই পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে এতে যে সামাজিক নীতি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: মানুষের চলাচলের পথ অকারণে সংকুচিত বা বন্ধ করে দেওয়া ইসলামের সামাজিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী।
আজকের ফুটপাত দখলের বাস্তবতায় এই নীতিটি নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
ফুটপাত দখলের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় পথচারীর। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ, নারী, অসুস্থ ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এর ঝুঁকি আরও বেশি। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার সুযোগ না থাকলে তাদের মূল সড়কে নেমে যেতে হয়। আর ব্যস্ত সড়কে হাঁটা মানেই দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকি।
একজন দোকানি হয়তো দোকানের সামনে এক-দুই ফুট জায়গায় পণ্য রাখলেন। একজন রেস্তোরাঁ মালিক ফুটপাতের অংশে কয়েকটি চেয়ার বসালেন। একজন গাড়ির মালিক ফুটপাতের ওপর মোটরসাইকেল রাখলেন। প্রত্যেকের কাছে বিষয়টি হয়তো সামান্য। কিন্তু একই আচরণ যখন শত শত মানুষ করে, তখন পুরো নগরের চলাচলব্যবস্থাই সংকুচিত হয়ে পড়ে।
এখানেই ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা সামনে আসে: ব্যক্তিগত সুবিধা এমন হতে পারে না, যা সামষ্টিক ক্ষতির কারণ হয়।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৮৮) আয়াতটিতে সরাসরি বিষয় ফুটপাতের কথা বলা নেই। কিন্ত অন্যের অধিকার অন্যায়ভাবে ভোগ না করার যে সাধারণ নীতি এতে রয়েছে, জনসম্পদ ও জনপথের ক্ষেত্রেও তা সমভাবে প্রাসঙ্গিক।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের চলাচলের পথকে কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, তা আরও স্পষ্ট হয় আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসে। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানের সত্তরের অধিক শাখা রয়েছে... আর রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া ঈমানের একটি শাখা।’ (মুসলিম, হাদিস : ৩৫)
ইসলামের রাস্তা নিছক একটি অবকাঠামো নয়; মানুষের নিরাপদ চলাচলের সঙ্গে যুক্ত একটি সামাজিক আমানত। রাস্তা থেকে কাঁটা সরানো যদি নেক কাজ হয়, তাহলে নিজের দোকানের পণ্য, চেয়ার-টেবিল, আবর্জনা কিংবা অন্য কোনো বস্তু রেখে সেই পথ সংকুচিত করা অবশ্যই বিপরীত নৈতিকতার উদাহরণ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) একবার সাহাবিদের রাস্তার ওপর বসতে নিষেধ করেছিলেন। সাহাবিরা প্রয়োজনের কথা বললে তিনি বলেন, যদি সেখানে বসতেই হয়, তাহলে রাস্তার হক আদায় করতে হবে। এরপর তিনি রাস্তার অধিকারের মধ্যে দৃষ্টি অবনত রাখা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া, সালামের জবাব দেওয়া, সৎকাজের নির্দেশ দেওয়া এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করার কথা উল্লেখ করেন। (বুখারি, হাদিস ২৪৬৫)
‘রাস্তার হক’ এই ধারণাটি আধুনিক নাগরিক জীবনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যে জায়গা দিয়ে মানুষ চলবে, সেখানে এমন কিছু করা যাবে না যাতে অন্য মানুষ কষ্ট পায়।
তাই ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা, পথ আটকে পণ্য রাখা কিংবা নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা শুধু জায়গা ব্যবহারের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অন্য মানুষের চলাচলের অধিকার। যা হরণ করার অধিকার কারও নেই।
নিজের প্রয়োজন পূরণে অন্যের অধিকার নষ্ট করার অনুমতি ইসলাম দেয় না। একজনের উপার্জনের পথ এমন হতে পারে না, যা আরেকজনের নিরাপদ চলাচলের পথ বন্ধ করে দেয়।
ফুটপাত দখলের জন্য কেবল ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে দায়ী করলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। নগর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হলো পথচারীর জন্য নির্ধারিত জায়গা সংরক্ষণ করা, দখল ঠেকানো, নির্মাণকাজ নিয়ন্ত্রণ করা এবং প্রয়োজনীয় বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা।
তাই তৃণমূল হকার ও ফুটপাত ব্যবসায়ীদের পরিকল্পিত পুনর্বাসন, নির্দিষ্ট বিক্রয়স্থান, পথচারীবান্ধব নগর পরিকল্পনা প্রণয়ণ নগর কর্তপক্ষের দায়িত্ব।
আমাদের মনে রাখতে হবে ফুটপাত শুধু ইট-বালুর তৈরি কয়েক ফুট জায়গা নয়। এটি একজন মানুষের নিরাপদে হাঁটার অধিকার। সেই অধিকার রক্ষা করা শুধু ভালো নাগরিক হওয়ার পরিচয় নয়; এটি ইসলামের সামাজিক নৈতিকতারও দাবি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক



