সফরের নববী আদব

প্রতীকী ছবি
সফর মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। জীবিকা, চিকিৎসা, আত্মীয়তা রক্ষা কিংবা জ্ঞানার্জনের প্রয়োজনে মানুষকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে হয়। ইসলাম সফরকে অর্থবহ ও ফলপ্রসু করে তুলতে এর জন্য এমন কিছু আদব ও শিষ্টাচার শিখিয়েছে; যেসব আদব মেনে চললে সফর যেমন নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হয়, তেমনি তা ইবাদতের রূপও লাভ করতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের রাতের প্রথমাংশে সফর করা উচিত। কেননা রাতের বেলা জমিন সংকুচিত হয়।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৭১) হাদিসে উল্লিখিত ‘জমিন সংকুচিত হয়’ কথাটির ব্যাখ্যায় আলেমরা বলেছেন, রাতের শীতল পরিবেশ, কম যানজট, মানুষের স্বাভাবিক প্রশান্তি এবং দীর্ঘ পথ সহজে অতিক্রম করার সুযোগের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। অতীতের মরুভূমির সফরে যেমন এটি বাস্তব ছিল, তেমনি আজও দীর্ঘ পথযাত্রায় ভোর বা রাতের প্রথমাংশ অনেক সময় অধিক স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ হতে পারে। তবে এটি কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নয়; বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী একটি নববী দিকনির্দেশনা।
সফরের আদবের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছে আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং সফরের দোয়া পাঠ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরে বের হওয়ার সময় আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা, তাকওয়া ও সহজতার জন্য দোয়া করতেন। (মুসলিম, হাদিস : ১৩৪২) এর মাধ্যমে একজন মুমিন উপলব্ধি করেন যে, প্রকৃত নিরাপত্তা কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে।
ইসলাম সফরে পরিকল্পনা ও প্রস্তুতিকেও গুরুত্ব দিয়েছে। প্রয়োজনীয় অর্থ, খাদ্য, ওষুধ, পরিচয়পত্র এবং যাতায়াতের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সুন্নাহসম্মত প্রজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা নিজেদের হাতে নিজেদের ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ১৯৫) তাই অসতর্কতা বা অবহেলার কারণে নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলা ইসলামের শিক্ষা নয়।
সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আদব হলো সঙ্গীদের প্রতি উত্তম আচরণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) সফরসঙ্গীদের সহযোগিতা করতেন এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার শিক্ষা দিতেন। তিনি বলেছেন, ‘যখন তিনজন সফরে বের হবে, তখন তারা একজনকে আমির (দলনেতা) নিযুক্ত করবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৬০৮)
ইসলাম সফরে সময়ের সদ্ব্যবহারেও উৎসাহিত করে। অপ্রয়োজনীয় কথা, ঝগড়া বা অন্যের কষ্টের কারণ না হয়ে যিকির, কোরআন তিলাওয়াত, চিন্তা ও আত্মসমালোচনায় সময় ব্যয় করা একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। একই সঙ্গে রাস্তা, যানবাহন ও জনসমাগমস্থলে অন্যের অধিকার রক্ষা করাও সফরের গুরুত্বপূর্ণ আদব।
গন্তব্যে প্রয়োজন শেষ হলে অযথা বিলম্ব না করে পরিবারের কাছে ফিরে আসতেও নবীজি (সা.) উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘সফর হলো শাস্তির একটি অংশ। তাই যখন কেউ তার প্রয়োজন পূর্ণ করবে, তখন সে যেন দ্রুত তার পরিবারের কাছে ফিরে আসে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৮০৪; মুসলিম, হাদিস :১৯২৭)
আজকের যুগে সফরের মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু নববী আদবের আবেদন কমেনি। সড়ক, রেল, নৌ কিংবা আকাশপথ, সর্বত্র দায়িত্বশীলতা, ধৈর্য, শৃঙ্খলা, সতর্কতা এবং আল্লাহর স্মরণ একজন মুসলিমের পরিচয় হওয়া উচিত। ট্রাফিক আইন মেনে চলা, সহযাত্রীদের প্রতি সৌজন্য দেখানো, পরিবেশ পরিষ্কার রাখা এবং অন্যের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়াও ইসলামের নৈতিক শিক্ষারই অংশ।
সফর শুধু এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়া নয়; এটি মানুষের চরিত্র, ধৈর্য ও তাকওয়ারও পরীক্ষা। তাই নবী করিম (সা.)-এর শেখানো আদব অনুসরণ করে প্রতিটি সফরকে নিরাপদ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও বরকতময় করে তোলাই একজন মুমিনের কাম্য হওয়া উচিত।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক




