সুখের মাপকাঠি বদলে দেয় যে হাদিস

প্রতীকী ছবি
মানুষ সুখী হতে চায়। কিন্তু সুখের সংজ্ঞা কী? কেউ মনে করেন বিপুল অর্থ-সম্পদই সুখের চাবিকাঠি। কেউ মনে করেন বিলাসবহুল বাড়ি, দামি গাড়ি কিংবা সামাজিক মর্যাদা অর্জন করলেই জীবনের পূর্ণতা আসে। আধুনিক পৃথিবীও যেন প্রতিনিয়ত এই ধারণাকেই আরও শক্তিশালী করে তুলছে। অথচ চৌদ্দশ বছর আগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এমন একটি হাদিস শুনিয়েছেন, যা সুখের প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দেয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরিবার-পরিজনের মধ্যে নিরাপদে সকালে উপনীত হয়, শারীরিকভাবে সুস্থ থাকে এবং তার কাছে এক দিনের খাদ্য থাকে, তবে তার জন্য যেন গোটা পৃথিবী একত্র করে দেওয়া হয়েছে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৬)
এই হাদিসে মানুষের সুখী জীবনের তিনটি মৌলিক ভিত্তি তুলে ধরা হয়েছে। এগুলো হলো নিরাপত্তা, সুস্বাস্থ্য এবং প্রয়োজনীয় রিজিক। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে প্রাসাদ, বিপুল সম্পদ বা ক্ষমতার কথা নেই। কারণ ইসলাম মানুষকে শেখায় যে, সুখের উৎস বাইরের প্রাচুর্যে নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতের সঠিক উপলব্ধিতে।
প্রথম নিয়ামত নিরাপত্তা :
হাদিসে প্রথমেই নিরাপত্তার কথাএসেছে। যুদ্ধ, সংঘাত, সন্ত্রাস কিংবা সামাজিক অস্থিরতায় বসবাসকারী মানুষই সবচেয়ে ভালো বোঝেন নিরাপদে একটি সকাল দেখার মূল্য কত বড়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা কুরাইশ গোত্রকে স্মরণ করিয়ে বলেছেন, ‘তিনি তাদের ক্ষুধার সময় খাদ্য দিয়েছেন এবং ভয় থেকে নিরাপত্তা দান করেছেন।’ (সুরা কুরাইশ: ৪)
নিরাপত্তা শুধু রাষ্ট্রীয় শান্তি নয়; পরিবার, সমাজ এবং ব্যক্তিজীবনের নিশ্চিন্ত পরিবেশও এর অন্তর্ভুক্ত। নিরাপত্তাহীন মানুষের কাছে পৃথিবীর সব সম্পদও অর্থহীন হয়ে যায়।
দ্বিতীয় নিয়ামত সুস্বাস্থ্য :
হাদিসের দ্বিতীয় নিয়ামত হিসেসেবে সুস্বাস্থ্যকে তুলে ধরা হয়েছে। মানুষ অসুস্থ হওয়ার পরই সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করে সুস্থ শরীর কত বড় সম্পদ। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ঈমানের পর সুস্থতার চেয়ে উত্তম কোনো নিয়ামত কাউকে দেওয়া হয়নি।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৫৮)
আজ মানুষ স্বাস্থ্য রক্ষায় কোটি কোটি টাকা ব্যয় করছে। অথচ প্রতিদিন সুস্থ শরীরে ঘুম থেকে ওঠার জন্য কতজন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করি?
তৃতীয় নিয়ামত প্রয়োজনীয় রিজিক :
হাদিসে এক বছরের নয়, বরং এক দিনের খাদ্যের কথা বলা হয়েছে। এটি মানুষকে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে শেখায়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নয়।’ (সুরা হুদ, আয়াত : ৬)
আজকের ভোগবাদী সমাজ মানুষকে প্রয়োজনের চেয়ে আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটতে শেখায়। ফলে চাহিদার শেষ থাকে না। কিন্তু ইসলামের শিক্ষা হলো, হালাল রিজিকে সন্তুষ্ট থাকা এবং আল্লাহর প্রতি আস্থা রাখা।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের জীবন দেখে অনেকেই নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করেন। অন্যের বাড়ি, গাড়ি, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা চাকরি দেখে নিজের প্রাপ্তিকে তুচ্ছ ভাবেন। অথচ এই হাদিস আমাদের শেখায়, নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় নিয়ামতগুলোকে আগে দেখো। তুমি কি নিরাপদ? তুমি কি সুস্থ? আজকের আহারের ব্যবস্থা কি আছে? যদি উত্তর 'হ্যাঁ' হয়, তবে তুমি আল্লাহর দেওয়া অমূল্য সম্পদের অধিকারী।
ইমাম ইবনু রজব আল-হাম্বলী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, মানুষের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হয়ে গেলে তার উচিত আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং অতিরিক্ত লোভে নিজেকে ক্লান্ত না করা। কারণ লোভের শেষ নেই, কিন্তু কৃতজ্ঞতার মধ্যেই রয়েছে প্রশান্তি।
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) লিখেছেন, প্রকৃত সম্পদ অর্থের আধিক্যে নয়; বরং অন্তরের সন্তুষ্টিতে। যার হৃদয়ে কানাআত (অল্পে তুষ্টি) আছে, সে দরিদ্র হয়েও ধনী। আর যার হৃদয়ে লোভ বাসা বাঁধে, সে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও নিজেকে অভাবী মনে করে।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ এবং প্রতিযোগিতার এই সময়ে হাদিসটির আবেদন আরও গভীর। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সুখ মানে সবকিছু অর্জন করা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতগুলো চিনতে শেখা।
প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি আমরা নিরাপদে থাকি, সুস্থ শরীরে চলাফেরা করতে পারি এবং পরিবারের জন্য দিনের আহারের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে আমাদের উচিত মহান আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ হওয়া। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) এই তিনটি নিয়ামতের সমষ্টিকেই সমগ্র পৃথিবীর সম্পদের সমান বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সুখের মাপকাঠি তাই সম্পদের অঙ্কে নয়, কৃতজ্ঞতার গভীরতায়। যে মানুষ আল্লাহর দেওয়া নিয়ামতকে চিনতে শেখে, তার জীবনেই নেমে আসে প্রকৃত প্রশান্তি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
saifpas352@gmail.com




